শিশুর টনসিল অপসারণ করার পর যে সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে

0
23

টনসিল অপসারণ, যা চিকিৎসাগতভাবে টনসিলেক্টমি নামে পরিচিত। এটি শিশুদের একটি সাধারণ অস্ত্রোপচার। যখন কোনো শিশুর ঘন ঘন টনসিলাইটিস হয়, টনসিল বড় হয়ে যাওয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট হয়, অথবা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকে, তখন এই অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। যদিও এই প্রক্রিয়াটি ঘুম, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে, তবে সেরে ওঠার সময় শিশুদের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

পর্যাপ্ত ব্যথানাশক, পর্যাপ্ত পানিপান এবং বিশ্রামের মাধ্যমে বেশিরভাগ শিশু ভালোভাবে সেরে ওঠে। তবে, অভিভাবকদের সম্ভাব্য জটিলতাগুলো সম্পর্কে জানা উচিত এবং কখন চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে তা জেনে রাখা উচিত।

১. গলা ব্যথা এবং গিলতে অসুবিধা

টনসিল অপসারণের পর গলা ব্যথা সবচেয়ে সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে একটি। খাবার গেলার সময়, পানি পান করার সময় বা এমনকী কথা বলার সময়ও শিশুরা উল্লেখযোগ্য অস্বস্তি অনুভব করতে পারে। একই স্নায়ু পথের কারণে এই ব্যথা কানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ব্যথা সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে এবং অস্ত্রোপচারের পর পঞ্চম থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে এটি সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। এর মানে এই নয় যে ক্ষতটি অবশ্যই সংক্রমিত হয়েছে। অস্বস্তি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ডাক্তাররা বয়স-উপযোগী ব্যথানাশক ঔষধের পরামর্শ দিতে পারেন। অভিভাবকদের নির্ধারিত মাত্রা মেনে চলা উচিত এবং চিকিৎসকের অনুমোদন ছাড়া কোনো ঔষধ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

২. রক্তপাতের ঝুঁকি

টনসিলেক্টমির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা হলো রক্তপাত। এটি অস্ত্রোপচারের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বা কয়েক দিন পরেও হতে পারে, বিশেষ করে যখন ক্ষতের সেরে ওঠা পৃষ্ঠটি আলাদা হতে শুরু করে।

কখনও কখনও অল্প পরিমাণে রক্ত ​​দেখা যেতে পারে, কিন্তু টনসিলের অস্ত্রোপচারের পর মুখ বা নাক থেকে তাজা রক্ত, অথবা বমিতে রক্ত ​​দেখা গেলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। এটি নিজে থেকে বন্ধ হয় কিনা তা দেখার জন্য অভিভাবকদের অপেক্ষা করা উচিত নয়।

যদি কোনো শিশুর রক্তপাত শুরু হয়, তবে তাকে অবিলম্বে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। গুরুতর রক্তপাতের ফলে মারাত্মক রক্তক্ষয় হতে পারে এবং এর জন্য আরেকটি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

৩. বমি বমি ভাব এবং বমি

অস্ত্রোপচারের পর কিছু শিশুর বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। অ্যানেস্থেসিয়া, ব্যথানাশক ওষুধ বা রক্ত ​​গিলে ফেলার কারণে এমনটা হতে পারে।

বারবার বমি করার ফলে শিশুর পক্ষে পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল পান করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শিশু পুরোপুরি জেগে উঠলে এবং নিরাপদে গিলতে পারলে, বাবা-মায়ের উচিত তাকে অল্প অল্প করে ঘন ঘন তরল পান করানো। ক্রমাগত বমি, রক্ত ​​বমি করা, বা তরল পেটে রাখতে না পারার ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ প্রয়োজন।

৪. ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা)

গিলতে কষ্ট হওয়ার কারণে শিশুরা স্বাভাবিকের চেয়ে কম পান করতে পারে। এর ফলে ডিহাইড্রেশন হতে পারে, বিশেষ করে যদি তাদের জ্বর থাকে বা তারা বমি করে।

এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে কম ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, কান্নার সময় কম কান্না এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি।

তাদের ঘন ঘন অল্প অল্প করে পানি বা অন্য উপযুক্ত তরল পান করতে উৎসাহিত করুন। আইস ললি এবং ঠান্ডা পানীয় কিছু শিশুর জন্য সহায়ক হতে পারে, যদি তারা নিরাপদে গিলতে পারে। শিশু যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে পান করতে না পারে বা ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ দেখায়, তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

৫. মুখে দুর্গন্ধ এবং কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন

অস্ত্রোপচার শেষে সেরে ওঠার সময় মুখে দুর্গন্ধ হওয়া একটি সাধারণ ব্যাপার, কারণ টনসিল অপসারণের পর সেরে ওঠা স্থানগুলোতে একটি সাদাটে বা হলদেটে আস্তরণ তৈরি হয়। এটি সাধারণত স্বাভাবিক নিরাময় প্রক্রিয়ার একটি অংশ এবং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয় না।

কিছু সময়ের জন্য শিশুর কণ্ঠস্বরও ভিন্ন শোনাতে পারে, বিশেষ করে যদি স্ফীত টনসিলের কারণে আগে কথা বলা বা মুখের পেছনের অংশের আকৃতিতে কোনো সমস্যা হয়ে থাকে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে, নাকী সুরের কণ্ঠস্বর স্থায়ী হতে পারে এবং এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। সাধারণত সেরে ওঠার সাথে সাথে এই পরিবর্তনগুলোও উন্নত হয়।

৬. জ্বর এবং সংক্রমণ

অস্ত্রোপচারের পর শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে, একটানা বা উচ্চ জ্বর, ব্যথা বৃদ্ধি, ফোলাভাব বাড়তে থাকা, অথবা শিশুর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকলে একজন ডাক্তারকে দিয়ে তা পরীক্ষা করানো উচিত।

সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যদিও সেরে ওঠার সময় অস্বস্তির এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অভিভাবকদের অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।

এছাড়াও, জার্নাল অফ ফ্যামিলি মেডিসিন অ্যান্ড প্রাইমারি কেয়ার-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে টনসিলেক্টমি শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।

৭. শ্বাসকষ্ট এবং অ্যানেস্থেসিয়া-সম্পর্কিত ঝুঁকি

টনসিলেক্টমি জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়ার অধীনে করা হয়। এর পরে সাময়িক বমি বমি ভাব, তন্দ্রাচ্ছন্নতা এবং গলায় অস্বস্তি হতে পারে। অ্যানেস্থেসিয়া-সম্পর্কিত গুরুতর জটিলতা বিরল, তবে শ্বাসকষ্ট হতে পারে, বিশেষ করে গুরুতর অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া বা কিছু নির্দিষ্ট অন্তর্নিহিত শারীরিক অসুস্থতাযুক্ত শিশুদের ক্ষেত্রে।

যদি শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, ঠোঁট নীল বা ধূসর হয়ে যায়, মারাত্মক ফোলাভাব দেখা দেয়, অথবা ঘুম থেকে উঠতে অস্বাভাবিক অসুবিধা হয়, তাহলে জরুরি সাহায্য নিন।