একগ্লাস দুধে কতটা ক্যালসিয়াম থাকে?

0
14

হাড় ও দাঁত মজবুত করার একটি সহজ উপায় হিসেবে এক গ্লাস দুধকে গণ্য করা হয়, কিন্তু এটি আসলে ঠিক কতটা ক্যালসিয়াম সরবরাহ করে? এর উত্তর নির্ভর করে দুধের ধরন, পরিমাণের (সার্ভিং সাইজ) এবং এর পুষ্টিগত উপাদানের ওপর। যদিও এটি শরীরের দৈনন্দিন ক্যালসিয়ামের সম্পূর্ণ চাহিদা পূরণ করতে পারে না, তবুও এই প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের একটি ভালো উৎস হিসেবে দুধ গুরুত্বপূর্ণ।

একগ্লাস দুধে কতটা ক্যালসিয়াম থাকে?

দুধে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ নির্ভর করে প্রাণীর ধরন, দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি এবং পরিমাণের ওপর। সাধারণ গরুর দুধের ক্ষেত্রে একটি আনুমানিক হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

দুধের পরিমাণ আনুমানিক ক্যালসিয়াম

১০০ মিলি ১২৫ মিলিগ্রাম

১৫০ মিলি ১৮৮ মিলিগ্রাম

২০০ মিলি ২৫০ মিলিগ্রাম

২৫০ মিলি ৩১৩ মিলিগ্রাম

এই হিসাবটি প্রতি ১০০ মিলিলিটারে প্রায় ১২৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকার ধারণার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। দুধের উপাদানভেদে প্রকৃত পরিমাণে তারতম্য হতে পারে।

সুইজারল্যান্ডের অ্যাগ্রোস্কোপ (Agroscope) কর্তৃক প্রকাশিত দুধের উপাদান সংক্রান্ত একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন ধরনের গরুর দুধে (যেমন- হোল মিল্ক, ইউএইচটি (UHT) মিল্ক এবং স্কিমড মিল্ক) প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ১২০-১২৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।

মনে রাখা প্রয়োজন যে, সব বাড়িতেই যে এক গ্লাস দুধ থেকে সমান পরিমাণ ক্যালসিয়াম পাওয়া যাবে, তা কিন্তু নয়। গরুর দুধ, মহিষের দুধ এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ উদ্ভিদ-ভিত্তিক বিকল্পগুলোর পুষ্টিগুণ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

শরীরের জন্য ক্যালসিয়াম কেন প্রয়োজন?

হাড় ও দাঁত মজবুত রাখার জন্য ক্যালসিয়াম অপরিহার্য। শরীরের প্রায় সমস্ত ক্যালসিয়াম এই কলাগুলোতে (tissues) জমা থাকে, আর সামান্য পরিমাণ রক্তে প্রবাহিত হয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কাজকর্মে সহায়তা করে।

এই খনিজ উপাদানটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার মধ্যে রয়েছে:

হাড়ের স্বাস্থ্য: এটি সারা জীবন হাড় গঠন করতে এবং হাড়ের শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

পেশির কার্যকারিতা: এটি পেশিকে সঠিকভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হতে সাহায্য করে।

স্নায়ু সংকেত আদান-প্রদান: এটি মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য অংশের মধ্যে স্নায়ুর মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানে সহায়তা করে।

রক্ত জমাট বাঁধা: এটি রক্ত ​​জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।

শৈশব ও কৈশোরে যখন হাড় দ্রুত বিকশিত হয় তখন পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও হাড়ের শক্তি বজায় রাখতে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে ক্যালসিয়াম প্রয়োজন।

প্রতিদিন আপনার কতটা ক্যালসিয়াম প্রয়োজন?

এন্ডোক্রাইন সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া-এর ২০২৬ সালের ঐকমত্য বিবৃতি (consensus statement) অনুযায়ী, বয়স ও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ভেদে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হয়।

বয়সসীমা দৈনিক ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা

১-৩ বছর বয়সী শিশু ৫০০ মিলিগ্রাম

৪-৬ বছর বয়সী শিশু ৫৫০ মিলিগ্রাম

৭-৯ বছর বয়সী শিশু ৬৫০ মিলিগ্রাম

প্রাপ্তবয়স্ক ১,০০০ মিলিগ্রাম

গর্ভবতী নারী ১,০০০ মিলিগ্রাম

স্তন্যদানকারী নারী ১,২০০ মিলিগ্রাম

একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জন্য, যার প্রতিদিন ১,০০০ মিগ্রা ক্যালসিয়াম প্রয়োজন, ২০০ মিলিলিটার দুধ (যা থেকে প্রায় ২৫০ মিগ্রা ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়) তার দৈনিক চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ পূরণ করতে পারে।

তবে শুধুমাত্র দুধের ওপর নির্ভর না করে পুরো খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। বিভিন্ন খাদ্য নির্দেশিকা এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

দুধ পান না করেও কি পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম পাওয়া সম্ভব?
হ্যাঁ। দুধ ক্যালসিয়ামের একটি সহজ উৎস হলেও, ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণের জন্য এটিই একমাত্র উপায় নয়।
ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ অন্যান্য খাবারের মধ্যে রয়েছে:

দই ও পনির: দুগ্ধজাত এই খাবারগুলোও দৈনন্দিন ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিল: এতে ক্যালসিয়াম থাকে এবং খাবারের সাথে পরিমিত পরিমাণে তিল যোগ করা যেতে পারে।

শাক-সবজি: শাকের কিছু ধরন, যেমন লাল শাক বা অন্যান্য শাক, ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।

ক্যালসিয়ামযুক্ত উদ্ভিদভিত্তিক পানীয়: বিভিন্ন পণ্যে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে, তাই কেনার আগে পুষ্টিগুণ সংক্রান্ত লেবেল দেখে নিন।

বেশি দুধ পান করলেই কি হাড় মজবুত হয়?

সব সময় তা নয়। হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্যালসিয়াম অপরিহার্য হলেও, প্রয়োজনের অতিরিক্ত দুধ পান করলেই যে হাড় আরও মজবুত হবে এমনটি নয়।

শরীরে ক্যালসিয়াম ভালোভাবে শোষিত হওয়ার জন্য ভিটামিন ডি-এর প্রয়োজন। হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ (বিশেষ করে ওজন বহনকারী ব্যায়াম), পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যারা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের (lactose intolerance) কারণে দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলেন, তারা ল্যাকটোজমুক্ত দুধ, দই (যদি সহ্য হয়) অথবা ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ বিকল্প খাবার গ্রহণ করতে পারেন। যাদের দীর্ঘস্থায়ী হজমজনিত সমস্যা রয়েছে বা যারা ক্যালসিয়ামের ঘাটতি নিয়ে চিন্তিত, তাদের উচিত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।