নীরব ঘাতক হাড় ক্ষয় রোগ কী এবং কেন হয়

0
261

বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটির তথ্য হিসেবে দেশে মোট জনসংখ্যার তিন শতাংশই অস্টিওপরোসিস বা হাড় ক্ষয় রোগে আক্রান্ত এবং এই রোগে নারীরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।

চিকিৎসকদের মতে, হার ক্ষয় রোগে আক্রান্তদের অনেকেই রোগ সম্পর্কে জানেন না এবং এই রোগে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে মৃত্যুও ঘটতে পারে।

চিকিৎসকদের তথ্যমতে বয়স্ক যারাই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের প্রতি দশজনের নয়জনই নারী।

চিকিৎসকদের ধারণা আগামী পাঁচ বছরে অসংক্রামক ব্যাধী হিসেবে শীর্ষ পাঁচে এই হাড় ক্ষয় রোগ উঠে আসবে।

হাড় ক্ষয় রোগ কী?
মানুষের শরীরের হাড়ের একটি গঠন প্রক্রিয়া আছে। জন্মের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হাড় নানাভাবে পরিপক্ব হতে থাকে। এরপর আবার ঘনত্ব কমে হাড় পাতলা হতে শুরু করে। হাড়ের ঘনত্ব যখন কমে যায় তখনই সেটা হাড় ক্ষয় রোগ নামে পরিচিত হয়।

আই রোগ হলে আক্রান্ত ব্যক্তির হাড়ের ঘনত্ব কমে গিয়ে হাড় ছিদ্রযুক্ত, দুর্বল এমনকি ভেঙ্গেও যেতে পারে। সঠিক সময়ে এর প্রতিরোধ বা চিকিৎসা না নিলে দৈনন্দিন কাজকর্ম, অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

মূলত হাড়ের স্ক্যান করে চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন যে এর ঘনত্ব কতটা কমেছে এবং সে অনুযায়ী তারা চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

হাড় ক্ষয় কেন হয়? কখন হয়?

সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বয়স পর স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষের হাড় ক্ষয় হয়ে থাকে। মানুষের শরীরের এ ধরনের পরিবর্তনের সাথে হরমোনের প্রভাব থাকে।

তবে নারীদের শরীর থেকে হরমোন খুব তাড়াতাড়ি কমে যায়। মহিলাদের ক্ষেত্রে এস্ট্রোজেন এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন হরমোনের অভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে মেয়েদের মাসিক বন্ধ হলে বা মেনোপোজের পর এটি বেশি হয়। আর হরমোন কমে গেলে শরীর থেকে দ্রুত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি বের হয়ে যায়।

মূলত শরীরে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি কমে গেলে তখন শরীর আর হাড় গঠন করতে পারে না। ফলে শুরু হয় হাড় ক্ষয়। এছাড়া যারা ক্যান্সার, রক্তরোগ, অপুষ্টি জনিত রোগ, কিডনি রোগে আক্রান্ত তাদের হাড় ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায়।

এর বাইরে চিকিৎসার জন্য যারা দীর্ঘদিন ধরে স্টেরয়েড সেবন করে তাদের হাড়েরও ঘনত্ব কমে গিয়ে হাড় ক্ষয় রোগ হতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে হাড় ক্ষয় একটি নীরব ঘাতক। অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তিনি এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

হাড় ক্ষয় রোগের লক্ষণ
১. হাড় ক্ষয় রোগের সাধারণ লক্ষণ হল পিঠ ব্যথা। বেশীরভাগ মানুষই পিঠের ব্যথা নিয়েই চিকিৎসকের কাছে যান। এছাড়া অনেকের মধ্যে কোমর ব্যথাও দেখা যায়।

২. হার ভঙ্গুর হয়ে পরে। ফলে অল্প আঘাতেই হাড় ভেঙ্গে যায়।

৩. মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষয় হলে মানুষ একটা পর্যায়ে গিয়ে কুঁজো হয়ে যায়। মেরুদণ্ড ছাড়াও কোমর, হাতের কব্জি, পায়ের কুচকির হাড়ের ক্ষয় হবার প্রবণতা অনেক বেশি।

৪. সাধারণ কাজকর্ম যেমন- ঝুঁকে কাজ করা, মোচড় দেওয়া বা শরীর প্রসারিত করা কষ্টকর হয় এবং তীব্র ব্যাথার উদ্রেক হয়।

৫. আরেকটা পরিচিত উপসর্গ যেটা দাঁতের এক্সরে করার মাধ্যমে দেখা যায়, তা হলো চোয়ালের হাড়ের ক্ষয়।

চিকিৎসা বা প্রতিকার কি?
এই রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের দিকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা।

১. প্রতিদিনের খাবার তালিকায় সুষম খাবার বিশেষ করে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার থাকতে হবে এবং এসব খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে ছোটবেলা থেকেই।

২. শারীরিক পরিশ্রম ও রোদে যাওয়াটাও হাড় ক্ষয় রোধে গুরুত্বপূর্ণ।

৩. প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট গায়ে রোদ লাগাতে হবে৷ কারণ হাড়ের প্রধান উপাদান হচ্ছে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি।

৪. শিশুদের পুডিং,দুধ, দই, সবুজ শাক-সবজি ও তাজা ফলমূল খাওয়ানোর পাশাপাশি বাইরে খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. ক্যালসিয়ামের জন্য নিয়মিত মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার খাওয়ার পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ খেতে হবে। এতে হাড় ভালো থাকবে।

৬. ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ করা এবং ডায়াবেটিস, লিভার, কিডনি রোগ থাকলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

৭. সতর্কতা হিসেবে বাসা বাড়িতে বাথরুমের পিচ্ছিল ভাব দূর করা, রাতে ঘরে মৃদু আলো জ্বালিয়ে রাখা এবং অন্ধকারে চলাফেরা না করা।

৮. এ রোগে আক্রান্তদের কোনোভাবেই অতিরিক্ত ওজন বহন করা উচিত নয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা