ঢেঁড়স খাওয়ার যত উপকারিতা

0
263
ঢেড়স
ঢেড়স খাওয়ার উপকারিতা

ঢেঁড়শ সবজি খাদ্য রসিক মানুষের পাত আলোকিত করে ৷ ভাজি, ঝোল ও অম্বল সব ধরনের রান্নাতেই ঢেড়শের বিশেষ গুণ রয়েছে ৷ যেসব সবজি সবচেয়ে বেশি খরা ও তাপ সহ্য করতে পারে, তাদের মধ্যে ঢেঁড়শ অন্যতম। শুকনো শক্ত মাটিতেও এটা টিকে থাকে। ঢেঁড়শের ফলের ভেতরে পিচ্ছিল পদার্থ থাকে, ফলে রান্না করার পরে পিচ্ছিল তরল বেরিয়ে আসে। এটা এড়ানোর জন্য ঢেঁড়শকে ভাজা হয়।

ঢেঁড়শ গাছ একটি বর্ষজীবী উদ্ভিদ। ঢেঁড়শের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাবেলমোছাস এসসিউলেনটাস। ফুল হয় ৪-৮ সেমি চওড়া। প্রতিটি ফুলে ৫টি পাপড়ি থাকে এবং পাপড়ির রং সাদাটে হলুদ। প্রতিটি পাপড়ির কেন্দ্রে লাল বা গোলাপি বিন্দু থাকে। ঢেঁড়শ ফল প্রায় ১৮ সেমি দীর্ঘ, দেখতে ক্যাপসুলের মতো এবং এর ভেতরে অসংখ্য বিচি থাকে।

ঢেঁড়শের আদি নিবাস ইথিওপিয়ার উচ্চভূমি এলাকায়। ঢেঁড়শ ইউরোপে লেডিস ফিঙ্গার নামে পরিচিত। ঢেঁড়শকে ইংরেজিতে ওকরা বলা হয়। ওকরা নামটি পশ্চিম আফ্রিকা থেকে এসেছে। আফ্রিকার বান্টু ভাষায় এটাকে বলা হয় কিঙ্গুম্বো। আরবি ভাষায় এর নাম বামিয়া । দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটিকে ভেন্ডি বা ভিন্ডি বলা হয়।

ঢেঁড়শে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার। যা ডায়াবেটিসকে দূরে রাখে। এই সবজির গ্লাইসেমিক সূচক কম। তাই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ‘আমেরিকান ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের মত অনুযায়ী, হাই ক্যালোরি, লো ফ্যাটের এই সবজি ডায়াবেটিসদের জন্য খুবই উপকারী।

আমাদের দেশ সারা বিশ্বের মধ্যে ডায়াবেটিস ক্যাপিটালে পরিণত হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, প্রতি বছর নতুন করে ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্তের সংখ্যাটাও প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষণা বলছে প্রতিদিন ৬-৮ টা ঢেঁড়শ খেলে শরীরে ইনসুলিনের উৎপাদন চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি পায়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে।

অনেকে ডায়াবেটিস নিয়ে ভয়ে থাকেন। নিয়মিত ঢেঁড়শ খেলে ডায়াবেটিস নিয়ে ভয়ে থাকতে হবে না। কারণ এর ভেতরে এমনকিছু উপাদান রয়েছে যা ডায়াবেটিসকে দূরে সরিয়ে আপনাকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে। শুধু তাই নয় খুব কম ফ্যাট থাকায় ওজন কমানোর ডায়াটে ঢেঁড়শ সবজি রাখার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢেঁড়শ সিদ্ধ, ভাজা, তরকারির পাশাপাশি ঢেঁড়শ ভেজানো পানিও খেতে পারেন।

যেভাবে বানাবেন ঢেঁড়শ ভেজানো পানি। প্রথমে ৪-৫টি ঢেঁড়শ ভালো করে ধুয়ে মাথা কেটে বাদ দিন। তারপর সবকটি ঢেঁড়শ লম্বালম্বিভাবে কেটে ফেলুন। এবার একটি কাচের জারে তিন কাপ পানি ঢেলে তাতে ঢেঁড়শগুলো সারারাত ভিজিয়ে রাখুন। সকালে ওই পানির মধ্যেই ঢেঁড়শগুলো ভালো করে চিপে অতিরিক্ত পানিটা বার করে ফেলে দিন ঢেঁড়শগুলো। এই পানি পান করলেই ডায়াবেটিস জব্দ হবে।

বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন মানুষের শরীরের সুগার লেভেল যখন বাড়ে সেই সময়ে ঢেঁড়শের বীজ খাওয়ার পর অবিশ্বাস্যভাবে সুগারের মাত্রা কমে যায়। কারণ ১০০ গ্ৰাম ঢেঁড়শের মধ্যে ক্যালোরির পরিমাণ মাত্র ৩৩। এই কারণেই এই খাবারকে অ্যান্টি ডায়াবেটিক খাবার বলা হয়ে থাকে।

সাধারণত খাওয়া দাওয়ার মানুষের রক্তে সুগারের পরিমাণ অনেকটা বেড়ে যায়। যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিন্তু ঢেঁড়শ খেলে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, যারা ডায়াবেটিসের আগের স্টেজ আছেন বা ডায়াবেটিস রোগে সবেমাত্র আক্রান্ত তারা কিন্তু ঢেঁড়শ খেয়ে রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।

দুশ্চিন্তার আধিক্যের জন্য ডায়াবেটিস রোগ চেপে বসে। এমনকি স্ট্রেস থেকে রক্তে সুগারের মাত্রাও বেড়ে যেতে পারে যা অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই দুশ্চিন্তা ও অত্যধিক মানসিক চাপ থেক রেহাই পাওয়া একান্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে এক্ষেত্রেও ঢেঁড়শের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। ঢেঁড়শে আছে প্রচুর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা আমাদের অক্সিডেটিভ স্ট্রেসকে কমাতে সাহায্য করে। এই স্ট্রেস কমলে আমাদের রক্তে সুগারের মাত্রা সহজে ওঠানামা করতে পারে না।

রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে তা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। হার্টের রোগের সমস্যা ও ডায়াবেটিস মিলে বড় সর্বনাশ করতে পারে যেকোনো রোগীর। তাই সুগারের মাত্রা ঠিক রাখার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ। ঢেঁড়শে কোনোরকম স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা কোলেস্টেরল থাকে না। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টই কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।

ঢেঁড়শের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট আমাদের শরীরের ক্লান্তি দূর করে। ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কাজের শক্তি আনতে ক্লান্তি দূর করা একান্ত প্রয়োজন। আর তার সমাধান লুকিয়ে থাকে ঢেঁড়শে। এটি ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি কার্ডিওভাসকুলার ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে যা শরীরকে সচল ও সতেজ রাখতে অত্যন্ত প্রয়োজন।

ঢেঁড়শে আছে প্রচুর ডায়েটরি ফাইবার। এতে থাকা ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিনের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ডায়েটরি ফাইবার ক্ষুধা মেটানো ও খাবার ঠিক ঠাক হজম করাতে সাহায্য করে।

ঢেঁড়শ রান্না করে খাওয়ার পাশাপাশি কেটে সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরদিন সেই পানিও খাওয়া যায়। এতে ঢেঁড়শের সব গুণই থাকে। তবে না ধুয়ে ঢেঁড়শ কখনোই খাবেন না।

ঢেঁড়শের ভেতর রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ফাইবার, ভিটামিন এ, সি এবং ফলেট। সেই সঙ্গে রয়েছে ভিটামিন কে, বি, আয়রন, পটাশিয়াম, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম, মেঙ্গানিজ, ম্যাগনেসিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বিটা ক্যারোটিন। সবকটি উপাদান একযোগে ডায়াবেটিস, অ্যাস্থেমা, অ্যানিমিয়া, ক্যানসারসহ একাধিক রোগকে দূরে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সঙ্গে ঢেঁড়শ কিডনির কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

১০০ গ্রাম ঢেঁড়শে ফ্যাটের পরিমাণ মাত্র ০.১৯ গ্রাম। শুধু কম ফ্যাট বলেই নয়, ১০০ গ্রাম ঢেঁড়শ থেকে মেলে অনেকটা ক্যালোরিও। তাই ‘লো ফ্যাট ডায়েট’-এ ঢেঁড়শের বিশেষ ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণই নয়, এই সবজি খাওয়ার উপযোগিতা আরও অনেক। কেন খাবার পাতে এই সবজি রাখতে হবে জানেন? দেখে নিন তার বিশেষ কয়েকটি কারণ। ঢেঁড়শে রয়েছে প্রচুর ফাইভার। ফাইবারের প্রাচুর্য দীর্ঘ সময়ের জন্য পেট ভরিয়ে রাখে। সহজে খিদে পায় না। এটি রক্তে শর্করার মাত্রাও দ্রুত গতিতে বাড়িয়ে তোলে না। এই সবজির আরেকটি বৈশিষ্ট্য— এটি হজম ক্ষমতা বাড়ায়। পাকস্থলির সুস্থতা বাড়াতেও এটি খুব কার্যকর।

ঢেঁড়শে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি ও সি। এছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়োডিন, ভিটামিন এ ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থ বিদ্যমান রয়েছে। ঢেঁড়শ নিয়মিত খেলে গলাফোলা রোগ হওয়র সম্ভাবনা থাকে না এবং এটা হজম শক্তি বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। ঢেঁড়শে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস ও আয়রন রয়েছে।

ঢেঁড়শে রিবোফ্লাবিনের পরিমাণ বেগুন, মুলা ও টমেটোর চেয়ে বেশি আছে। এটা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। পেটের প্রস্রাব ও পায়খানা পরিষ্কার করতে ঢেঁড়শের অনেক গুণ। খুসখুসে কাশিতেও উপকার করে এই সবজিটি। হজমশক্তি বাড়ায়, বাতের প্রকোপ কমায়। ডায়বেটিসের জন্য অনেক উপকারী। প্রোস্টেট গ্ল্যান্ডের ক্ষরণ দূর করে এই ঢেঁড়শ।

গর্ভাবস্থায় ভ্রূণ তৈরির জন্য ভালো ঢেঁড়শ গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের মস্তিষ্ক তৈরিতে সাহায্য করে, মিসক্যারেজ হওয়া প্রতিরোধ করে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নিয়মিত ঢেঁড়শ খেলে এর ফলেট উপাদানটি গর্ভের শিশুর সঠিক বিকাশে সাহায্য করে।

ঢেঁড়শ কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। ঢেঁড়শের উচ্চমাত্রার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ক্ষতিকর ফ্রি রেডিকেলসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে।

নিয়মিত ঢেঁড়শ খেলে লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন বেড়ে যায়। ফলে সহজেই রক্তশূন্যতা দূর হয়। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নিয়মিত ঢেঁড়শ খেলে এর ফলেট উপাদানটি গর্ভের শিশুর সঠিক বিকাশে সাহায্য করে।

ঢেঁড়শে আছে বেটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, লিউটিন যা চোখের গ্লুকোমা, চোখের ছানি প্রতিরোধে সাহায্য করে।

গলগণ্ড রোগ দূর করে ঢেঁড়শ। আয়োডিনের অভাবে সৃষ্ট গলগণ্ড- রোগ এবং মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ড- দুর্বলতার প্রতিরোধে দারুণ কার্যকর। প্রতিটি ঢেঁড়শে রাইবোফ্লাভিনের পরিমাণ বেগুন, মুলো, টমেটো আর শিমের থেকে বহুগুণ বেশি।

এছাড়া কিডনি ভালো রাখতে প্রতিদিনই ঢেঁড়শ খাওয়া উচিত। শরীর ভালো রাখতে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই সঙ্গী করে নিন ঢেঁড়শকে আজ থেকেই ৷