অন্ত্রের কৃমি পরজীবী কৃমি যা দূষিত খাবার বা পানি, ভালোভাবে না ধোয়া ফল ও সবজি, আধসেদ্ধ মাংস, অথবা দূষিত মাটি ও পৃষ্ঠতলের সংস্পর্শের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সাধারণ প্রকারগুলোর মধ্যে রয়েছে গোলকৃমি, হুককৃমি, চাবুককৃমি এবং পিনকৃমি। উপসর্গগুলো উপস্থিত কৃমির প্রকার ও সংখ্যার ওপর নির্ভর করে। হালকা সংক্রমণে খুব কম বা কোনো উপসর্গ নাও দেখা যেতে পারে, অন্যদিকে গুরুতর সংক্রমণ হজমে সমস্যা করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে পুষ্টির ঘাটতি ঘটাতে পারে। সতর্কতামূলক লক্ষণগুলো জানা থাকলে, পেটের সব সমস্যাই কৃমির কারণে হচ্ছে- এমনটা ধরে না নিয়ে আপনি সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারবেন। জেনে নিন কৃমি থাকার কিছু লক্ষণ
১. পেটে ক্রমাগত ব্যথা
অন্ত্রের কৃমির কিছু সংক্রমণের সঙ্গে ব্যাখ্যাতীত পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। ব্যথাটি হালকা হতে পারে এবং মাঝে মাঝে আসতে পারে, যার ফলে এটিকে সহজেই বদহজম বা অন্য কোনো হজমের সমস্যা বলে ভুল করা যেতে পারে। তবে পেটে ব্যথার অনেক সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে, তাই এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কৃমির সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়।
২. ঘন ঘন ডায়রিয়া বা মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন
থেরাপিউটিক অ্যাডভান্সেস ইন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, কিছু কৃমি সংক্রমণের কারণে ডায়রিয়া, পাতলা পায়খানা বা স্বাভাবিক মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন হতে পারে। অন্য ক্ষেত্রে, মানুষের কোষ্ঠকাঠিন্য বা ঘন ঘন মলত্যাগের সমস্যা হতে পারে। ক্রমাগত ডায়রিয়া, বিশেষ করে যখন এর সঙ্গে দুর্বলতা, ওজন হ্রাস বা পানিশূন্যতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. মলদ্বারে চুলকানি, বিশেষ করে রাতে
রাতে মলদ্বারের চারপাশে তীব্র চুলকানি পিনওয়ার্ম সংক্রমণের একটি প্রধান লক্ষণ। স্ত্রী পিনওয়ার্ম রাতে মলদ্বারের চারপাশে ঘোরাফেরা করতে পারে এবং আশেপাশের ত্বকে ডিম পাড়তে পারে। এই চুলকানির কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে এবং বারবার চুলকানোর প্রবণতা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে অস্থির ঘুম, খিটখিটে ভাব বা ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া লক্ষণীয় হতে পারে।
৪. মলে কৃমি বা কৃমির মতো বস্তু দেখা যাওয়া
কখনও কখনও মলে কৃমি বা কৃমির অংশ দেখা যেতে পারে। পরজীবীর প্রকারভেদের ওপর নির্ভর করে এদের চেহারা ভিন্ন হতে পারে। মলের মধ্যে থাকা প্রতিটি সুতোর মতো বা ফ্যাকাশে পদার্থই কৃমি নয়। খাদ্যের আঁশ এবং শ্লেষ্মা কখনও কখনও দেখতে একই রকম হতে পারে। যদি আপনি বারবার কোনো অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করেন, তবে নিজে থেকে এটি শনাক্ত করার চেষ্টা না করে একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
৫. কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া
কিউরিয়াস জার্নাল অফ মেডিকেল সায়েন্সে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, কিছু অন্ত্রের পরজীবী, যেমন সিকাল পিনওয়ার্ম, পুষ্টি শোষণে বাধা দিতে পারে বা খাবার থেকে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। এটি কারণ ছাড়া ওজন কমার একটি কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যখন সংক্রমণ গুরুতর হয়। খাদ্যাভ্যাস বা শারীরিক কার্যকলাপ পরিবর্তন না করে ওজন কমলে তা সবসময় খতিয়ে দেখা উচিত, কারণ এর অনেক কারণ থাকতে পারে।
৬. অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা
কিছু নির্দিষ্ট কৃমি, বিশেষ করে হুকওয়ার্ম, অন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। গুরুতর সংক্রমণের কারণে আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা হতে পারে, যার ফলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা বা ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে। ক্লান্ত বোধ করার অর্থ এই নয় যে আপনার কৃমি হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী বা ব্যাখ্যাতীত ক্লান্তির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৭. ক্ষুধার পরিবর্তন
অন্ত্রের কৃমি সংক্রমণে আক্রান্ত কিছু মানুষের ক্ষুধা বেড়ে যেতে বা কমে যেতে পারে। তবে ক্ষুধার পরিবর্তন শুধুমাত্র কৃমি সংক্রমণের ক্ষেত্রেই হয় না, বরং এটি হজম, বিপাক এবং মানসিক বিভিন্ন সমস্যার কারণেও হতে পারে। ক্ষুধার দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের সঙ্গে ওজন হ্রাস বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে তা পরীক্ষা করানো উচিত।
৮. বমি বমি ভাব বা বমি
কিছু পরজীবী সংক্রমণের কারণে বমি বমি ভাব, বমি, পেট ফাঁপা বা হজম সংক্রান্ত অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই উপসর্গগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে বা এর সঙ্গে তীব্র পেটে ব্যথা, ওজন হ্রাস বা মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তন দেখা দিলে তা আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৯. পেট ফাঁপা এবং অতিরিক্ত গ্যাস
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ক্লিনিকস অফ নর্থ আমেরিকা জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, পরজীবী সংক্রমণের সময় কিছু মানুষ পেটে ফাঁপা ভাব, গ্যাস বা অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন। তবে এই লক্ষণগুলো খুবই সাধারণ এবং ফুড ইনটলারেন্স, কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম বা অন্যান্য পরিপাকতন্ত্রের অসুস্থতার কারণেও হতে পারে।
কাদের অন্ত্রের কৃমি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি?
সংশ্লিষ্ট পরজীবীর ওপর নির্ভর করে, হাতের সঠিক পরিচ্ছন্নতা না থাকা, দূষিত খাবার বা পানি, দূষিত মাটিতে খালি পায়ে হাঁটা এবং আধসিদ্ধ মাংস বা মাছ খাওয়ার কারণে ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাড়িতে, স্কুলে এবং শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের কারণে শিশুরাও পিনওয়ার্মের সংস্পর্শে বেশি আসতে পারে।
ভালো স্বাস্থ্যবিধি এই ঝুঁকি কমাতে পারে। শৌচাগার ব্যবহারের পর এবং খাবার খাওয়া বা প্রস্তুত করার আগে সাবান দিয়ে আপনার হাত ধুয়ে নিন। ফল ও শাক-সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিন, নিরাপদ পানি পান করুন এবং মাংস সঠিকভাবে রান্না করুন।







