যেখানে বার্ধক্য মানে সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বস্তির জীবন

0
222

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ শুধু চিকিৎসা চায় না—চায় যত্ন, সম্মান, নিরাপত্তা আর কিছু শান্ত মুহূর্ত। চায় খোলা আকাশের নিচে একটু নিঃশ্বাস নিতে, বিকেলের আলোয় ফুলের সৌন্দর্য দেখতে কিংবা পাখির ডাক শুনে কিছুটা সময় কাটাতে। বার্ধক্যের এই সংবেদনশীল সময়ে একজন প্রবীণের সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়ে ওঠে—মানবিক সান্নিধ্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন।

বাংলাদেশে সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, পূর্বাচলের নিকটে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক হাসপাতাল। এটি শুধু একটি রিটায়ারমেন্ট হোম নয়; বরং প্রবীণদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, যেখানে শেষজীবনকে উপভোগ্য ও সম্মানজনক করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশে নির্মিত এই প্রতিষ্ঠানটির চারটি সুবিশাল ভবনের নাম রাখা হয়েছে বাংলাদেশের নদীনির্ভর ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে—পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সুরমা। প্রতিটি ভবনই আধুনিক ও প্রবীণবান্ধব অবকাঠামোয় নির্মিত। করিডর, লিফট ও হুইলচেয়ার সুবিধাসহ এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যেন একজন প্রবীণ ব্যক্তি সহজেই নিজের চলাচল ও দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করতে পারেন।

এখানে রয়েছে ২৩২টি আধুনিক স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট, যেখানে প্রবীণরা স্বাধীনভাবে বসবাসের পাশাপাশি পাচ্ছেন সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, নার্স ও প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভারদের নিবিড় পরিচর্যা। প্রতিটি কক্ষেই স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত চেকআপ ও জরুরি সেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেন পরিবার থেকে দূরে থেকেও তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন।

বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হসপিস ও প্যালিয়েটিভ কেয়ারে। যেসব প্রবীণ ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত বা জীবনের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন, তাঁদের জন্য এখানে তৈরি করা হয়েছে এক ভিন্নধর্মী মানবিক পরিবেশ। কেউ যদি শেষ বিকেলে আকাশ দেখতে চান, তবে তাঁর হাসপাতালের বেড বা হুইলচেয়ার সরাসরি ছাদে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ফুলে ঘেরা ছাদ, খোলা বাতাস ও নীরব প্রকৃতি তাঁদের মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।

শুধু স্বাস্থ্যসেবাই নয়, প্রবীণদের পুষ্টি, মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পৌঁছে দেওয়া হয় সরাসরি অ্যাপার্টমেন্টে। পাশাপাশি রয়েছে হাঁটার জায়গা, সবুজ পরিবেশ ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ, যা প্রবীণদের একাকিত্ব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশে যেখানে যৌথ পরিবারব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রবীণদের একাকিত্ব বাড়ছে, সেখানে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক হাসপাতাল নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি প্রমাণ করছে—বার্ধক্য কোনো বোঝা নয়; বরং জীবনের এমন একটি অধ্যায়, যা সম্মান, ভালোবাসা ও সেবার মাধ্যমে আরও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক সরদার এ নাঈম দেশের চিকিৎসা অঙ্গনের একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি অর্জনকারী এই চিকিৎসক বাংলাদেশে আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির পথিকৃৎ হিসেবেও পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি মানবিকতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও মানবিক ও আধুনিক সেবাকেন্দ্র গড়ে উঠুক—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।

লেখক:
ডা. ফয়সল মাহমুদ
এমবিবিএস, এম.পি.এইচ (এইচ.এম)
সহকারি পরিচালক
জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক হাসপাতাল।