মাসিক চক্র দশদিন দেরিতে শুরু হওয়া, কাজের চাপে ক্লান্ত থাকায় দম্পতিদের বারবার শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে যাওয়া, অথবা মাসের পর মাস গর্ভাবস্থা পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসা- এগুলোকে আলাদা সমস্যা মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা স্ট্রেস হয়তো এগুলোর সবগুলোর পেছনেই ভূমিকা রাখছে।
বিশের কোঠার শেষ দিকে বা ত্রিশের কোঠায় থাকা অনেক মানুষের জীবন এখন এক অবিরাম ভারসাম্য রক্ষার লড়াই। কাজের সময়সীমা (ডেডলাইন), দীর্ঘ যাতায়াত, আর্থিক দুশ্চিন্তা, পরিবারের প্রত্যাশা এবং সবকিছু ঠিকঠাক চালিয়ে নেওয়ার চাপ- সব মিলিয়ে জীবন যেন এক জটিল ঘূর্ণাবর্ত। এর ফলে ঘুমের সময় কমে যায়, খাওয়া-দাওয়ার নিয়ম থাকে না, এমনকী সপ্তাহ শেষের ছুটির দিনগুলোও পড়ে থাকে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার চাপে। অধিকাংশ মানুষই একে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেন।
কিন্তু শরীর হয়তো বিষয়টিকে এতটা সহজভাবে নিচ্ছে না। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ নারী ও পুরুষ- উভয়ের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি মাসিক চক্র ও ডিম্বস্ফোটনে (ovulation) বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যৌন আকাঙ্ক্ষাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে শুক্রাণুর গুণমানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য এই যোগসূত্রটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
যখন মানসিক চাপের প্রভাব পড়ে মাসিক চক্রে
অনেক নারীই প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করেন তা হলো, তাদের মাসিক চক্র আর আগের মতো নিয়মিত বা অনুমানযোগ্য নেই। কখনও মাসিক চক্র দীর্ঘায়িত হয়, কখনও মাসিক পুরোপুরি বন্ধ থাকে, আবার কখনও মাসিকের আগের শারীরিক অস্বস্তিগুলো (premenstrual symptoms) সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এর পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। শরীর যখন দীর্ঘস্থায়ী চাপের মধ্যে থাকে, তখন এটি কর্টিসলের মতো কিছু হরমোন নিঃসরণ করে। এই হরমোনগুলো মস্তিষ্ক ও ডিম্বাশয়ের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া সংকেতগুলোতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
মানসিক চাপ মস্তিষ্ক ও ডিম্বাশয়ের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে, যা ডিম্বস্ফোটন এবং মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলোর ওপর প্রভাব ফেলে। মানসিক চাপের কারণে মাসিকের আগের শারীরিক সমস্যাগুলো- যেমন ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মেজাজের পরিবর্তন আরও তীব্র হতে পারে। তবে মাসিক অনিয়মিত হওয়ার পেছনে সবসময়ই যে মানসিক চাপ দায়ী, তা কিন্তু নয়। পিসিওএস (PCOS) বা থাইরয়েডজনিত সমস্যার মতো শারীরিক অবস্থাতেও এমন পরিবর্তন হতে পারে, তাই সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
পুরুষরাও প্রভাবিত হন
প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি নিয়ে আলোচনার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীদের ওপর বেশি আলোকপাত করা হয়, বিশেষ করে যখন মাসিক চক্র অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তবে মানসিক চাপ কেবল একজন সঙ্গীর ওপরই প্রভাব ফেলে না। তরুণ দম্পতিদের ক্ষেত্রে সন্তান ধারণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সময় কাজের চাপ, আর্থিক উদ্বেগ এবং অপর্যাপ্ত ঘুমের মতো বিষয়গুলো প্রায়ই উঠে আসে।
মানসিক চাপ কেবল মনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি শরীরের ওপরও প্রভাব ফেলে; আর প্রজননতন্ত্র প্রায়শই সবার আগে এই চাপের আঁচ পায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ টেস্টোস্টেরনের মাত্রা, যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং লিঙ্গোত্থান ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় মানসিক চাপের সঙ্গে শুক্রাণুর ঘনত্ব ও গতিশীলতার পরিবর্তনের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। জেবিআরএ অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকশন (JBRA Assisted Reproduction) জার্নালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা- যেখানে ১১,১৪১ জন পুরুষকে নিয়ে করা ৩৪টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, মানসিক চাপে থাকা পুরুষদের বীর্যের গুণমান বা প্যারামিটারগুলো তুলনামূলকভাবে খারাপ।
পর্যালোচিত গবেষণগুলোর মধ্যে ৫২.৯ শতাংশে শুক্রাণুর ঘনত্ব কম থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আর ৬৩.৩ শতাংশ গবেষণায় শুক্রাণুর গতিশীলতা কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এর মানে এই নয় যে, মানসিক চাপে থাকা প্রতিটি পুরুষেরই প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যা হবে। এই ফলাফলগুলো কেবল একটি পারস্পরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়; এটি এমন কোনো প্রমাণ নয় যে কেবল মানসিক চাপের কারণেই শুক্রাণুর গুণমান খারাপ হয়।
এরপর আসে সন্তান নেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে জড়িত মানসিক চাপ
যেসব দম্পতি সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের ওপর অপ্রত্যাশিতভাবে চাপের সৃষ্টি হতে পারে। শুরুতে হয়তো কর্মক্ষেত্র বা ব্যক্তিগত দায়িত্ব থেকে এই চাপের উৎপত্তি হয়। কিন্তু যখন গর্ভধারণ ঘটে না, তখন সন্তান নেওয়ার এই প্রচেষ্টা নিজেই উদ্বেগের আরেকটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন ডিম্বস্ফোটনের ক্যালেন্ডার দেখা, ফার্টাইল দিনগুলো হিসাব করা, চিকিৎসকের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো বিষয়গুলো যুক্ত হয়। সম্পর্কের যে অংশটি অত্যন্ত অন্তরঙ্গ হওয়ার কথা, তা তখন সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে এমন একটি কাজের মতো মনে হতে পারে। মানসিক চাপ ডিম্বস্ফোটন ও ঋতুচক্র নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের সংকেতগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অপর্যাপ্ত ঘুম, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তবে প্রজনন সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার একমাত্র কারণ হিসেবে মানসিক চাপকে দায়ী করা ঠিক নয়। মানসিক চাপ থাকলেই যে কেউ বন্ধ্যা হয়ে যাবে-বিষয়টি এমন নয়। বয়স, ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর স্বাস্থ্য, ডিম্বস্ফোটন প্রক্রিয়া এবং শরীরের অন্য কোনো অন্তর্নিহিত শারীরিক সমস্যা- এসব কিছুই প্রজনন ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি ছয়জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন তাদের জীবদ্দশায় বন্ধ্যাত্বের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যাগুলো কেবল অতিরিক্ত মানসিক চাপের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। দৈনন্দিন জীবন থেকে মানসিক চাপের প্রতিটি উৎস পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে দৈনন্দিন রুটিনে ছোটখাটো পরিবর্তন স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করতে পারে। সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো, নিয়মিত খাবার খাওয়া এবং শারীরিক কার্যকলাপের জন্য সময় বের করার পরামর্শ দেন। প্রতিদিন হাঁটা, যোগব্যায়াম করা, গান শোনা কিংবা কেবল কিছুটা সময় নিজের মতো করে কাটানোর অভ্যাস আপনাকে মানসিক চাপ থেকে অনেকটা দূরে থাকতে সাহায্য করবে।







