রোগীর দায়িত্ব নেয়া একজন চিকিৎসকের গল্প!

0
164

শিরোনাম দেখে আপনার মনেও প্রশ্ন জাগতে পারে রোগীর দায়িত্ব চিকিৎসক নেবেন কেন? এ প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ চিকিৎসক শুধু রোগীই দেখেন! সরকারি হসপিটালগুলোতে রুটিনওয়ার্ক পালন করেন। মাস শেষে বেতন। আর বেসরকারি হসপিটালে বা চেম্বারে ভিজিট নিয়ে রোগী দেখে ওষুধ লিখে দেন। এতে রোগী ভালো হলে ‘ভালো’! না হলে অকপটে বলে দেন আপনি অন্য ডাক্তারের কাছে যান। ততদিনে দেখা গেল কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে।

চিকিৎসা একটি সেবামূলক পেশা। মানুষ মূলত বাঁচার জন্য চিকিৎসকের কাছে যান। কথায় বলে, সৃষ্টিকর্তার পর যদি কেউ বাঁচাতে পারে, তিনি হলো ডাক্তার। আর মানুষ সেই ভরসাতেই হসপিটাল বা ডাক্তারের চেম্বারে ছুটে যান। আমি এখানে ‘রোগীর দায়িত্ব নেয়া’ বলতে তার ভরণপোষণের দায়িত্বের কথা বলিনি। বলতে চেয়েছি, একজন রোগী যখন কোনো ডাক্তারের আন্ডারে চিকিৎসা নেন, তাকে পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও ভরসা করেই তার কাছে যান। সেই বিশ্বাস ও ভরসার মূল্য বোঝেন কয়জন চিকিৎসক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ‘বিশ্বাস ও  ভরসা’ টাকায় মাপেন অধিকাংশ চিকিৎসক।

তবে, রোগীর বিশ্বাস ও ভরসার মূল্য দেয়া ডাক্তারও রয়েছে এ দেশে। আর তাদের কারণেই পৃথিবী এখনও সুন্দর। আর সেরকম একজন চিকিৎসকের কথাই বলব।

রোগী রায়হান চৌধুরী (ছদ্মনাম)। ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে একজন চিকিৎসকের আন্ডারে হসপিটালে ভর্তি। বহু রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। রায়হান ও তার পরিবারের ভরসা এখান থেকে সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরবেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ রক্ত পরীক্ষায় দেখা গেল তার প্লাটিলেট নেমে গেছে ৭ হাজারে। আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তিনি। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার খানিকটা চিন্তিত। এতদিন যখন প্লাটিলেট ভারসাম্য পর্যায় ছিল। ডাক্তার নিশ্চিন্তে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।

রোগীর এমন অবস্থায় চিন্তিত পরিবারের সদস্যরা। কী করা যায় ভেবে পাচ্ছিলেন না। চোখেমুখে অন্ধকার পরিবারের সদস্যদের। এ মুহূর্তে রোগী ও পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা তো ডাক্তারই দিতে পারবে বা দেয়া উচিত। কিন্তু এখানে ঘটল উল্টো ঘটনা। ওই চিকিৎসক রায়হানকে এমন গুরুতর অবস্থায় হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়ার কথা বলে দিলেন। এটার মানে স্পষ্ট, রোগী যদি মারা যায়। সেই দায়টা বা দুর্নামটা যেন ওই হাসপাতাল বা চিকিৎসকের না হয়।

কণ্ঠশিল্পী নচিকেতা চিকিৎসকদের ‘কসাই’ বললেও আমি তা বলতে চাই না। শুধু বলতে চাই, এরা চিকিৎসক হয়েছে কিন্তু মানুষ হয়নি।

চিকিৎসকের কথা শুনে রায়হানের পরিবার হতাশায় পড়ে যায়। আর রোগী রায়হান সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে থাকেন। এরই মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক মো. সালেহ উদ্দিন মাহমুদকে (তুষার) ফোন দেন রায়হানের পরিবারের কেউ। সব কিছু শুনে ডাক্তার তুষার তাকে বলেন, ‘আমার আন্ডারে ওখানে ভর্তি থাকুক, আমি হসপিটালে কথা বলে দিচ্ছি। রিলিজ নেয়ার দরকার নেই। আমি দেখছি।’

ডাক্তার তুষারের এমন কথায় মরুভূমির বুকে যেন বৃষ্টি নামল। কারণ সংকটাপন্ন যে রোগীকে একজন ডাক্তার ছেড়ে দিলেন। তিনি কোনোকিছু না ভেবে নিজে দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। রায়হান ও তার পরিবারের কাছে ডাক্তার তুষার যেন দেবদূত হয়ে হাজির হলেন।

এরপর রায়হানের চিকিৎসা চলতে থাকল ডা. তুষারের আন্ডারে। দুদিন/তিন দিনের মাথায় রক্তের প্লাটিলেট বাড়ল। দিন যায় স্বাভাবিক হতে থাকে রায়হানের শারীরিক অবস্থা। এভাবে চলার পর শারীরিক পরিস্থিতি মোটামুটি স্টেবল অবস্থায় এলে, ডা. তুষার তাকে হসপিটাল থেকে রিলিজ নিতে বললেন। এরপর বাসাতেই রায়হানের চিকিৎসা চলল। মৃত্যুমুখ থেকে ফেরা রায়হান এখন ভালো আছে।

চিকিৎসকদের কাছে আমার অনুরোধ, শুধু ভিজিট, রাইন্ড ফি আর পরীক্ষার কমিশন না খেয়ে রোগীর দায়িত্ব নিন। আমরা বাঁচার জন্য আপনাদের কাছে যাই। সেই আপনারা যদি বিপদের সময় আমাদের দূরে ঠেলে দেন, তাহলে আমরা কোথায় যাব। সবশেষ বলতে চাই, আমরা যে পেশাতেই থাকি না কেন, প্রথমে ‘মানুষ’ হতে হবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের কর্ম সম্পাদন করলেই পৃথিবী আরও সুন্দর  হবে।

 

ডা. মো. সালেহ উদ্দিন মাহমুদকে (তুষার) 

এমবিবিএস, বিসিএস(স্বাস্থ্য), স্পোর্টস মেডিসিনে এমএসসি (যুক্তরাজ্য), রিজেনারেটিভ মেডিসিনে এমফিল (কিংস কলেজ, লন্ডন), বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দলের স্পোর্টস মেডিসিন পরামর্শদাতা।

‘Provident Health’ এবং কর্পোরেট ‘MyDoctor’ এর ক্রীড়া ও ব্যায়াম, ওষুধ ও সুস্থতা বিশেষজ্ঞ।

২০২১ সালে National Youth Award, ‘eCAB Mover's Award' এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার `Chikisha-Ratno’ পেয়েছেন তিনি।

 

 

লেখক

প্রভাষ চৌধুরী

ন্যাশনাল ডেস্ক ইনচার্জ
সময় টিভি (ওয়েব)
ঢাকা।

ই-মেইল:provash@somoynews.tv