রাস্তায় জুসের নামে কী খাচ্ছি আমরা?

0
531
রাস্তার জুস
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার অলিগলিতে রয়েছে ফলের জুসের দোকান বা জুস বার। এছাড়া রাস্তার পাশে ফুটপাতে বিক্রি হয় লেবু বা আখের শরবত। রাজধানীর পল্টন, আজিমপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায় একই চিত্র।

পল্টনে রাস্তার পাশে লেবুর শরবত খেতে আসা শফিক বলেন, ‘এই শরবত কতটা স্বাস্থ্যসম্মত জানি না। বেশি গরম লেগেছে বলেই খাচ্ছি।’

লেবুর শরবত বিক্রেতা জানান, তিনি বড় ফিল্টারে করে শরবত বানান। কিন্তু এই পানি নিরাপদ কিনা জানেন না। আর শরবতে ব্যবহৃত বরফ কেনেন বরফ কল থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের শিক্ষার্থী সিজার বন্ধুকে নিয়ে জুস খেতে এসেছেন আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী জুস কর্নারে। তিনি বলেন, ‘এখানকার জুস ভালো লাগে। আমরা হলে যে জুস খাই, তার তুলনায় এটা ভালো। হলে চিনি বেশি দেয়, সঙ্গে অল্প পরিমাণ ফল দিয়ে কোনও রকমে বানিয়ে দেয়। এখানে ফলের পরিমাণ বেশি থাকে। অথচ হলে এবং এখানে দাম একই।’

চাকরিজীবী রানা তার সহকর্মীকে নিয়ে অফিসের কাজে এসেছিলেন নীলক্ষেতে। সেখান থেকে ঢাকেশ্বরী জুস কর্নারে এসেছেন জুস খেতে। রানা বলেন, ‘বাদামের শরবত নিয়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে দাম অনুযায়ী এর মান ঠিকই আছে। তারা ফিল্টার পানি দিয়ে জুস বানাচ্ছে। কিন্তু গ্লাস ঠিকভাবে ধোয়া হচ্ছে কিনা তা জানি না।’

চকবাজারের ব্যবসায়ী আহাদ আহমেদ শান্ত। তিনি জানান, সপ্তাহে প্রায় চার দিনই ঢাকেশ্বরীতে আসেন জুস খেতে। তিনি বলেন, ‘এখানকার জুসে ভেজাল কম। ভালো ফল ব্যবহার করা হয়। কোক-পেপসি খাওয়ার চেয়ে ফলের জুস খাওয়া ভালো।’

ঢাকেশ্বরী জুস কর্নারের প্রতিষ্ঠাতা নরেশ দেবনাথ। তিনি বলেন, ‘আমি ২৬ বছর ধরে এই ব্যবসা করে আসছি। প্রথমে জিগাতলায় জুসের ব্যবসা করতাম। তারপর লালবাগ শাহী মসজিদের বিপরীতে শুরু করি, ওই দোকান এখনও আছে। তারপর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সামনে শুরু করেছিলাম। সেটা বন্ধ করে এখন আজিমপুরে শুরু করেছি। এখানে প্রায় সাত থেকে আট বছর ধরে আছি।’

জুস ও শরবত বিক্রির স্থায়ী বা ভাসমান দোকানগুলোতে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেকের মধ্যে
নিজের দোকানের জুসের মান নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দোকানে কোনও ভেজালের কাজ নাই। আমরা ফিল্টারের পানি ব্যবহার করি। আর ফল আনি বাদামতলী থেকে। ফল রাখার আলাদা ডিপ ফ্রিজ আছে, সেখানে রাখি। আমার সাধ্যমতো নির্ভেজাল জিনিসই মানুষকে খাওয়ানোর চেষ্টা করি।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে মানুষের শরীর থেকে ঘাম আকারে পানি বের হয়ে যায়। ফলে তীব্র পিপাসা পায়। এ সময় পথচারী বা রাস্তায় যারা কাজ করেন, তারা রাস্তার পাশে বিভিন্ন ধরনের শরবত বা পানীয় পান করে থাকেন। এই পানীয় গ্রহণ করার প্রথম বিপদ হলো—এগুলো যে পানি দিয়ে তৈরি করা হয়, সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাকে অনিরাপদ। আবার শরবত বানানোর বা পরিবেশনের ক্ষেত্রে যে পাত্র ব্যবহার করা হয়, সেগুলোও পরিষ্কার থাকে না। এই শরবতগুলো ঠান্ডা করার জন্য যে বরফ দেওয়া হয়, সেগুলোতেও অনিরাপদ পানি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে বরফ বানানোর যে কলগুলো রয়েছে, সেখানে নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে আমরা এখনও দেখিনি।’

তিনি বলেন, ‘এই অনিরাপদ পানি বা বরফ দিয়ে বানানো শরবত খাওয়ার ফলে টাইফয়েড, জন্ডিস, হেপাটাইটিসের মতো রোগ ছড়াতে থাকে। গরমের সময় ঢাকায় পানিবাহিত অসুখ বেড়ে যায়। বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো— যত্রতত্র এসব শরবত বা পানীয় পান করা।’

ডা. লেলিন আরও বলেন, ‘যারা বাইরে কাজে বের হবেন, তারা যেন বাসার ফুটানো পানি বা ফিল্টার পানি সঙ্গে নিয়ে বের হন। আর যারা রিকশা চালান বা কায়িক শ্রমের কাজ করেন, তারা নিরাপদ পানির সঙ্গে ওরস্যালাইন মিশিয়ে পান করুন।’