ব্রেস্ট ক্যানসার বা স্তন ক্যানসার – নামটা শুনলেই অনেকের বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু ভয় পাওয়ার আগে একটা কথা পরিষ্কার করে জানা দরকার – ক্যানসার মানেই মৃত্যু নয়। ঠিক সময়ে ধরা পড়লে আর সঠিক চিকিৎসা হলে আজকাল অনেকেই স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাচ্ছেন। আর এই পুরো চিকিৎসার পথটা ঠিক করে দেয় একটি বিষয় – ক্যানসারের স্টেজ।
সহজ করে বললে, স্টেজ মানে ক্যানসার শরীরের কতটা জায়গা দখল করেছে, কোথায় কোথায় ছড়িয়েছে। চলুন একেবারে সহজ ভাষায় জেনে নিই ব্রেস্ট ক্যানসারের স্টেজগুলো সম্পর্কে –
যেভাবে স্টেজ নির্ধারিত হয়
চিকিৎসকেরা সাধারণত একটা পদ্ধতি মেনে চলেন। এর নাম টিএনএম সিস্টেম। এটি তৈরি করেছে আমেরিকান জয়েন্ট কমিটি অন ক্যানসার। এই পদ্ধতিতে দেখা হয় –
টি (Tumor): টিউমারের আকার কত বড়
এন (Node): আশপাশের লিম্ফ নোডে ক্যানসার ছড়িয়েছে কি না
এম (Metastasis): শরীরের দূরের কোনো অঙ্গে ক্যানসার গেছে কি না
২০১৮ সাল থেকে এর সাথে আরও কিছু বিষয় যুক্ত হয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় বায়োমার্কার। যেমন – হরমোন রিসেপ্টর ও হারটু (HER2) স্ট্যাটাস, ক্যানসারের গ্রেড (স্বাভাবিক কোষের তুলনায় কেমন দেখাচ্ছে), অনকোটাইপ ডিএক্স নামের জিন টেস্ট, যা ক্যানসার ছড়ানোর ঝুঁকি জানায়। সব মিলিয়ে চিকিৎসকেরা স্টেজ ০, ১, ২, ৩ না ৪ – তা নির্ধারণ করতে পারেন।
ব্রেস্ট ক্যানসারের সাধারণ লক্ষণ
সবাই একই রকম লক্ষণ অনুভব করেন না। অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো- ব্যথাহীন লিম্ফ নোড, বগল বা কলারবোনের পাশে লিম্ফ নোড, স্তনে ব্যথা বা ফুলে যাওয়া, স্তনের চামড়ায় গর্ত, লালচে ভাব বা খসখসে ভাব, নিপল থেকে রক্ত বা তরল বের হওয়া, নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া – ইত্যাদি।
এবার একে একে স্টেজগুলো সম্পর্কে জেনে নিই-
স্টেজ ০: ক্যানসার আছে, কিন্তু ছড়ায়নি
এটা একেবারে শুরুর ধাপ। একে বলা হয় ডাক্টাল কারসিনোমা ইন সিটু। ক্যানসার কোষ শুধু দুধ বহনের নালির ভেতরেই থাকে, আশপাশের টিস্যুতে ছড়ায় না। এই পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
স্টেজ ১: ক্যানসার ছড়ানো শুরু
এটি প্রথম আক্রমণাত্মক (ইনভেসিভ) ধাপ। এসময় ক্যানসার মূল জায়গা ছাড়িয়ে আশপাশে ছড়াতে শুরু করে। এখানে দুটি ভাগ রয়েছে।
স্টেজ ১এ – এ টিউমার ২ সেন্টিমিটারের কম থাকে ও লিম্ফ নোডে ছড়ায় না। তবে স্টেজ ১বি – এ টিউমার ছোট বা চোখে না-ও পড়তে পারে। তবে কাছের লিম্ফ নোডে সামান্য ক্যানসার কোষ পাওয়া যায়।
স্টেজ ২: ক্যানসার আরও বিস্তৃত
এখানে ক্যানসার একটু শক্ত অবস্থানে চলে আসে। এই স্টেজও দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
স্টেজ ২এ – টিউমার থাকে না বা ২ সেন্টিমিটারের কম থাকে। ৩টি পর্যন্ত লিম্ফ নোডে ছড়াতে পারে।
স্টেজ ২বি – এ টিউমার ২–৫ সেন্টিমিটার হতে পারে। লিম্ফ নোডে ছড়াতে পারে। অথবা টিউমার ৫ সেন্টিমিটারের বেশি, কিন্তু লিম্ফ নোডে যায়নি।
স্টেজ ৩: ক্যানসার বেশ ছড়িয়ে পড়ে
এই ধাপে ক্যানসার স্তনের বাইরেও ছড়াতে শুরু করে। এখানে তিনটি ভাগ রয়েছে।
স্টেজ ৩এ – এ টিউমার যেকোনো আকারের হতে পারে। এবং ৪–৯টি লিম্ফ নোডে ছড়াতে পারে।
অথবা, টিউমার ৫ সেন্টিমিটারের বেশি, তবে লিম্ফ নোড কম আক্রান্ত হতে পারে।
স্টেজ ৩বি – এ টিউমার বুকের দেয়াল বা স্তনের চামড়ায় ছড়ায়। কলারবোন বা বগলের লিম্ফ নোড আক্রান্ত হয়।
স্টেজ ৩সি – এ টিউমার যেকোনো আকারের হতে পারে। ১০টির বেশি লিম্ফ নোড আক্রান্ত হতে পারে। এবং কলারবোনের আশপাশেও ছড়িয়ে পড়ে।
স্টেজ ৪: ক্যানসার শরীরের অন্য জায়গায়
একে বলা হয় মেটাস্ট্যাটিক ব্রেস্ট ক্যানসার। এটি সবচেয়ে জটিল ধাপ। এসময় ক্যানসার স্তন ছাড়িয়ে শরীরের দূরের অঙ্গে যেমন – হাড়ে, ফুসফুসে, লিভারে, কখনো মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে।
লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, ওজন কমে যাওয়া, শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যথা। এই স্টেজে পুরোপুরি সারানো কঠিন হলেও চিকিৎসার মাধ্যমে জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক রাখা যায়।
কোন স্টেজে বাঁচার সম্ভাবনা কতটা?
আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী – শুধু স্তনে সীমাবদ্ধ হলে প্রায় ৯৯% মানুষ ৫ বছর বা তার বেশি বাঁচেন। কাছের লিম্ফ নোডে ছড়ালে বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় ৮৬%। দূরের অঙ্গে ছড়ালে সম্ভাবনা প্রায় ৩১%। সব মিলিয়ে বাঁচার গড় হার প্রায় ৯১%।
ব্রেস্ট ক্যানসারের স্টেজ জানা মানে চিকিৎসার পথ পরিষ্কার হওয়া। কোন চিকিৎসা লাগবে, কতটা সময় লাগতে পারে – সবকিছুই স্টেজের ওপর নির্ভর করে। তাই নিজের রিপোর্ট বুঝে নিতে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। ভয় নয়, সচেতনতাই পারে জীবন বাঁচাতে।






