পরিবেশ দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় কারণ ইটভাটা

0
106
ইটভাটা
ছবি: সংগৃহীত

বছরে পাঁচ থেকে ছয় মাস শুষ্ক মৌসুমে দেশে ইট উৎপাদিত হয়। বাকি মাসগুলোয় ইট উৎপাদনের কার্যক্রম অনেকটা বন্ধ থাকে। শুষ্ক মৌসুমে একদিকে বায়ুমণ্ডলে ধুলাবালির প্রাদুর্ভাব, অন্যদিকে ইটখোলাগুলো থেকে নির্গত দূষিত উপাদানের প্রাদুর্ভাবে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, বছরে প্রায় ১৫ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড ইটখোলা থেকে বায়ুমণ্ডলে যোগ হচ্ছে।

ইটখোলায় জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আমদানিকৃত নিম্নমানের কয়লা। এ কয়লা পোড়ানোয় প্রচুর পরিমাণে ছাই তৈরি হয়। অন্যদিকে ইটভাটা থেকে বায়ুমণ্ডলে দূষিত উপাদানও যোগ হচ্ছে। এসব দূষিত উপাদানের মধ্যে পার্টিকুলেট ম্যাটার, কার্বন মনোঅক্সাইড, সালফার অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলে ইটখোলা থেকে ৫৩ হাজার ৩৩৩ টনের বেশি পার্টিকুলেট ম্যাটার-১০ বায়ুমণ্ডলে যোগ হয়েছে। অন্যদিকে ১৭ হাজার ৫৫৭ টন পার্টিকুলেট ম্যাটার-২.৫ এবং ৫৯ হাজার ২২১ টনেরও বেশি সালফার অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যোগ হয়েছে। যদি এই দূষিত উপাদানের নির্গমন বায়ুমণ্ডলে অব্যাহত থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে নাকচ করে দেওয়া যায় না।

গবেষণায় দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু উভয়ের জন্য পার্টিকুলেট ম্যাটার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ইটভাটা থেকে নির্গত এই দূষিত উপাদান মানবদেহে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করলে রেসপিরেটরি সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ইটভাটার আশপাশে বসবাসরত মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। গবেষণায় আরও পাওয়া যায়, বর্তমানে বায়ুতে পার্টিকুলেটস ম্যাটারের উপস্থিতিতে মানুষের মৃত্যুর হার আগের তুলনায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বায়ুতে মাত্রাতিরিক্ত সালফার ডাইঅক্সাইডের উপস্থিতির কারণে মানুষ চোখ, নাক, গলাসহ অ্যাজমাটিক সমস্যার সন্মুখীন হচ্ছে। মোটা দাগে বলা যেতে পারে, বায়ুতে দূষিত উপাদানের উপস্থিতিতে ফুসফুসে ক্যান্সার, হার্ট অ্যাটাক ও অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুর হার বেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে অনেক আবাসিক এলাকায়ও ইটভাটা দেখা যায়। উদ্যোক্তারা আবাসিক জায়গা থেকে ইটখোলাগুলো সরিয়ে নিতে খুব একটা আগ্রহী নন। ফলে দেখা যাচ্ছে, ইটখোলার আশপাশে বসবাসরত মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। ইটখোলা থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড একটি অন্যতম গ্রিনহাউস গ্যাস। অনবায়নযোগ্য জ্বালানি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বনায়ন ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে। যদি অপরিকল্পিত ইটখোলা স্থাপনের কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ অনেক বেড়ে যাবে। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণে ইটভাটার ভূমিকাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

ইট তৈরিতে ব্যবহৃত মাটিতে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। উচ্চ তাপে ওই মাটিতে উপস্থিত ক্যালসিয়াম কার্বনেট ভেঙে ক্যালসিয়াম অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়। এভাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতি কেজি ইট তৈরিতে শুধু মাটি থেকে প্রায় ২৫ গ্রাম কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যোগ হয়, যা বায়ু দূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

ইটভাটা থেকে নির্গত ছাই পার্শ্ববর্তী নদী বা জলাশয়ে নিষ্কাশিত হয়। ওই বর্জ্য পানিতে মিশে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত উপাদান যেমন- লেড, ক্যাডমিয়াম, জিংক ও ক্রোমিয়াম জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলের দ্বারা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। ফলে মানুষ বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত জটিল রোগের সম্মুখীন হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বছরে প্রায় ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ বায়ুদূষণের প্রভাবে মারা যায়। এর প্রায় ৫৯ শতাংশই মারা যায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। বায়ুতে বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতির কারণে প্রায় ২২০ মিলিয়ন শিশু শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত নানাবিধ অনাকাঙ্ক্ষিত রোগের প্রাদুর্ভাবের সম্মুখীন হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ফিক্সড চিমনি পদ্ধতিতে এক হাজার ইট উৎপাদনে প্রায় ৪২৮ কেজি কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যোগ হচ্ছে। ওই হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি ইট তৈরিতে ৪২৮ গ্রামের বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যোগ হচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। প্রতি কেজি ইট তৈরিতে গড়ে সাসপেন্ডেট পার্টিকুলেট ম্যাটার শূন্য দশমিক ৭৯ গ্রাম, পার্টিকুলেট ম্যাটার-১০ শূন্য দশমিক ৪৫ গ্রাম, পার্টিকুলেট ম্যাটার-২.৫ শূন্য দশমিক ২৭ গ্রাম, সালফার ডাইঅক্সাইড ১ দশমিক ৬৫ গ্রাম এবং নাট্রোজেন অক্সাইড শূন্য দশমিক শূন্য ৫২ গ্রাম প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে যোগ হচ্ছে।

কৃষি জমির ওপরও ইটভাটার ঋণাত্মক প্রভাব রয়েছে। সাধারণত জমির উপরের মাটিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতির কারণে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। যদি ওই উপরের মাটি প্রতিনিয়ত সরিয়ে ইট তৈরিতে ব্যবহার হয়, তাহলে জমির উর্বরতা শক্তি দিন দিন হ্রাস পাবে। মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় ভবিষ্যতে মোট কৃষিজ উৎপাদনের ওপর ঋণাত্মক প্রভাব সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এটা ঠিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে ইটভাটার অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বিপুল এ জনসংখ্যার দেশে মানুষের বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু বিদ্যমান ইটখোলাগুলো পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা বাড়িয়ে দিচ্ছে সেদিকে দৃষ্টিপাত করাও অত্যন্ত জরুরি। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় ইটখোলা পরিচালনার ব্যাপারে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। প্রথমত, ইটখোলাগুলো আবাসিক জায়গা থেকে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার দূরে স্থানান্তর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষি ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত মাঠ থেকেও কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার দূরে ইটখোলা স্থাপন করতে হবে। তৃতীয়ত, ইটভাটায় ব্যবহৃত মাটি কৃষিজমি থেকে সংগ্রহের পরিবর্তে নদীনালার সেডিমেন্ট ও চর অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে, যেখানে কৃষি ফসলের কোনো ধরনের ক্ষতি হবে না। চতুর্থত, খোলা মাঠে ফিক্সড চিমনি পদ্ধতির পরিবর্তে টানেল পদ্ধতিতে ইট উৎপাদনের ওপর আগ্রহ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিনিয়ত ইটখোলার বায়ুতে উপস্থিত দূষিত উপাদানের পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে। যদি বায়ুতে দূষিত উপাদানের উপস্থিতি মানবদেহের জন্য সহনশীল মাত্রা অতিক্রম করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ইট উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। ষষ্ঠত, ইটখোলায় উৎপাদিত বর্জ্য যেমন অ্যাস-ছাই কখনো পানিতে-জলাশয়ে ফেলা যাবে না। সপ্তমত, সমগ্র দেশে ইটভাটা দ্বারা কী পরিমাণ দূষিত উপাদান বায়ুমণ্ডলে যোগ হচ্ছে তার একটি সুস্পষ্ট ডেটা ব্যাংক তৈরি করা যেতে পারে। অষ্টমত, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহায়তায় ইটভাটাগুলো নিয়মিত পরিদর্শন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ইটখোলায় বায়ুর গুণাগুণ পরীক্ষা করার জন্য ল্যাবরেটরি স্থাপন করা যেতে পারে। নবমত, ইটভাটায় কর্মরত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, বর্ধিত জনসংখ্যার বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের জন্য ইটখোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে ইটভাটা থেকে নির্গত দূষিত উপাদানের প্রভাবে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে এসব ঝুঁকি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে তবেই ইট উৎপাদন অব্যাহত রাখা যেতে পারে।