দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, সঙ্গে শ্রেণিবৈষম্য। এই দুইয়ের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে বিবেক এবং মানবিকতা। এর ভুক্তভোগী হয় এক বেলা ভালো করে খেতে না পারা মানুষ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
আমরা পৃথিবীর অর্ধেক বাসযোগ্য জমিকে খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করি, শেষ পর্যন্ত সেই খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশ ফেলে দিই। বেশিরভাগ মানুষ বুঝতে পারে না যে তারা কতটা খাবার নষ্ট করছে। বুঝতে পারে না যে কীভাবে খাদ্যের অপচয় পরিবেশের ক্ষতি করে।
যখন একটি ভাগাড়ে ফেলে দেয়া খাবার পঁচতে থাকে, তখন শুধু খাবার নষ্ট হয় না বরং যারা খেতে পায় না তাদের সঙ্গে পরোক্ষ অন্যায় করা হয়। সঙ্গে এটি তৈরিতে ঢেলে দেয়া সব অর্থ- সম্পদ, যেমন- ব্যবহৃত জমি, শ্রম, পানি এবং জ্বালানিও নষ্ট হয়।
আবার ভাগাড়ে খাদ্য পঁচে উৎপাদিত মিথেন মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের ১.৬ শতাংশ তৈরি করে। এটি খুব বেশি মনে না হলেও, বায়ুদূষণ বিবেচনায় এটি একটি বড় শতাংশ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে খাদ্যের অপচয় একটি বড় বাধা। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সির (ইপিএ) খাদ্য বর্জ্য বিশেষজ্ঞ ক্লডিয়া ফ্যাবিয়ানো বলেন, ‘যদিও আমাদের খাদ্য বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু প্রথমেই আমাদের খাদ্যকে বর্জ্য তৈরিতে বাধা দিতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে বাড়িতে বেশি খাবার অপচয় করি, তাই আমাদের অভ্যাসের ছোট পরিবর্তনগুলোও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন- পরিমিত খাবার তৈরি করা, ফ্রিজে সঠিক উপায়ে খাবার সংরক্ষণ করা, অতিরিক্ত খাবার ক্ষুধার্তদের দান করে দেয়া ইত্যাদি।
এ ছাড়া খাদ্য অপচয় রোধ করার একটি সাধারণ উপায় সম্পূর্ণটা খাওয়া। যেমন- ফুলকপির মতো শাকসবজিতে পুরোপুরি ভোজ্য পাতা থাকলেও আমরা সাধারণত ফুলের অংশটিকেই খেয়ে থাকি।
বিশ্বব্যাপী পচনশীল খাদ্যের অধিকাংশই ফ্রিজে রাখা হয় না। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রেফ্রিজারেশন অনুসারে, প্রায় ১২ শতাংশ খাবার অপর্যাপ্ত হিমায়নের কারণে খারাপ হয়ে যায়।
ইনস্টিটিউট অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্সের ২০১৪ সালের একটি রিপোর্ট অনুসারে, শুধু হিমায়ন প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলো এক চতুর্থাংশ খাদ্য অপচয় রোধ করতে পারে। হিমায়িত খাবার ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বন্ধ করে এবং এই প্রক্রিয়ায় খাবার পচে যাওয়ার আগে পুনরুদ্ধার করার সময় থাকে।
ফ্রিজের পেছনে রেখে দিয়ে ভুলে যাওয়া ভাত, একটি শুকিয়ে যাওয়া ফল এমনকি ফল ও সবজির খোসাগুলোতে পর্যন্ত সব সময় কিছু খাদ্য উপাদান অবশিষ্ট থাকে। খাদ্য যদি অপচয় হয়েই যায়, তবে তা পশুদের খাওয়ানোতে ব্যবহার করা হতে পারে পরবর্তী সেরা বিকল্প।
ক্যাফেটেরিয়া এবং রেস্তোরাঁগুলো তাদের খাবারের উচ্ছিষ্ট পুনরুদ্ধার করতে এবং পুনরায় বিতরণ করতে সহায়তা করে এমন সংস্থার অংশীদার হতে পারে। নিজ উদ্দ্যেগে বণ্টন করতে পারে।
খাদ্য উপস্থিত জৈব পদার্থগুলোকে নতুন শক্তিতে রূপান্তরিত করা যেতে পারে রেন্ডারিং এবং অ্যানেরোবিক হজমের মতো প্রক্রিয়াগুলোর মাধ্যমে।
অ্যানেরোবিক হজম পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি উপাদান তৈরি করতে খাদ্য বর্জ্য ব্যবহার করে, যা সার কিংবা মিশ্রসার হিসেবে পুনর্ব্যবহার করা যেতে পারে। তরল চর্বি দিয়ে লিপস্টিক এবং সাবানের মতো পণ্যগুলোতে রেন্ডারিং করা যেতে পারে।
আমরা যে পরিমাণ খাবার কিনি, তৈরি করি এবং খাই তা নিয়ে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। খাবার নষ্ট হওয়ার আগে এর যথাযথ ব্যবহার আমাদের নিশ্চত করতে হবে। নষ্ট হবার পরও যে সুযোগ গুলো থাকে সেগুলো প্রয়োগ করে পরিবেশ রক্ষা করতে হবে।

