বাংলাদেশর রাজধানী ঢাকা। ছোট্ট এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যত স্বপ্ন, যত পরিকল্পনা সবই ঢাকাকে ঘিরে। কারো চাকরি দরকার- ঢাকা যাও। কারো উন্নত চিকিৎসা দরকার- ঢাকা পাঠাও। কারো সন্তানের ভালো শিক্ষা দরকার- আসতে হবে ঢাকা। কেউ যদি শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে স্বপ্ন দেখে, যদিও কেউ মনে মনে ভাবে সে বড় মাপের শিল্পী হবে; তাকেও আসতে হবে ঢাকা। একটি দেশের সমস্ত কিছুই রাজধানী কেন্দ্রিক। তাই তো আঠারো কোটির এই জনসংখ্যার দেশে শুধুমাত্র রাজধানীতে বসবাস করে প্রায় আড়াই কোটির বেশি মানুষ। তাহলে কেমন করে কাটে রাজধানীতে বসবাসরত এই জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন?
যারা ঢাকার বাইরে থাকে বা কোনোদিন ঢাকা আসেনি, তারা মনে মনে ভাবে- ইস ! যদি ঢাকা যেতে পারতাম, যদি ঢাকায় থাকতে পারতাম। আবার যারা ঢাকায় থাকে, তাদের অনেকেই উপায়ান্তর না পেয়ে এই শহরে থাকে। কেউ কেউ বলে- জীবনের বড় অভিশাপের নাম ঢাকায় থাকা। বৈচিত্রময় এই শহরের মানুষগুলোও বড় বৈচিত্র। এই শহরে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ-ই পাবেন। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, দরিদ্র, ছিন্নমূল সব শ্রেণির মানুষ-ই এই শহরে বসবাস করে। শ্রেণি বৈচিত্রের পাশাপাশি চারিত্রিক বৈচিত্রতাও রয়েছে এই শহরে। বড় বড় আন্তর্জাতিক মাফিয়া, সন্ত্রাসী, চোরাকারবারী, চোর, ছিনতাইকারী, দালাল শ্রেণি যেমন আছে এই শহরে, বড় বড় কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজ কর্মীসহ নানারকম মানবিকগুণ সম্পন্ন মানুষও এই শহরে আছে। কথায় কথায় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে উত্তেজিত হয়ে মানুষের শরীর থেকে রক্ত ঝরানোর লোকজনের যেমন অভাব নেই, তেমনি মানুষের বিপদে অসুস্থতায় রক্ত দেওয়া কিংবা রক্ত সংগ্রহ করে দেবার লোকের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। এই শহর সত্যিই এক বিচিত্রময় শহর। এখানে টিকে থাকার জন্য যেমন লড়াই সংগ্রাম করতে হয়, আবার বিভিন্ন ধরণের কাজের সুযোগ সুবিধাও আছে। তবে এই শহরের সবচেয়ে সংকটের নাম হলো যানজট। শুধুমাত্র যানেজটের কারণে জাতি হিসেবে আমরা অর্থনৈতিক দিক থেকে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছি। যানজটের কারণে ঢাকা শহরে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ তো গেল অর্থনৈতিক ক্ষতি, মানসিক ক্ষতিও তো কম নয়। ধরুন, একজন মানুষ উত্তরা থেকে মতিঝিল অফিস করবে, তাহলে তাকে ভোর ৬টায় ঘুম থেকে উঠতে হয়। গোসল, নাস্তা করা, রেডি হওয়া সবকিছু মিলিয়ে ৭টা বেজে যায়। তারপর যখন সে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন তার অফিসে পৌঁছাতে বেলা ১০টা বেজে যায়। অতঃপর সন্ধ্যায় যখন তার অফিসটাইম শেষ হয় তখন তাকে রাস্তায় নেমে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে করতে অনেক সময় ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। কেন না ঐ সময় সমস্ত পাবলিক বাসই লোকজনে ভর্তি থাকে, সিট পাওয়া যায় না। অনেক বাস থামতেও চায় না। ঐ অবস্থায় লোকটিতে অন্যান্য যাত্রিদের সাথে ঠেলাঠেলি করে গাড়িতে উঠতে হয়। এরপর শুরু হয় ভয়াবহ জ্যাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকে বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ১০টা বেজে যায়। একটা দিনের প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা যখন একজন মানুষের রাস্তায় কেটে যায়, স্বাভাবিকভাবে তার মেজাজ হয়ে যায় খিটখিটে। বাসায় এসে তার আর অন্যকাজ করার মানসিকতা থাকে না। কারণে অকারণে রাগ হয়। যার প্রভাব গিয়ে পড়ে তার শিশু বাচ্চাদের ওপর। এভাবে প্রতিদিন জীবনের সাথে লড়াই করতে করতে মানুষ এক সময় পাথর হয়ে যায়। মানুষের ভিতর থেকে মানবিকতা উবে যায়। সবাইকে বেঁচে থাকার চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক দুই মিনিট সময় হয়ে দেখা দেয় মহাগুরুত্বপূর্ণ, মহামূল্যবান। তাই রাস্তাঘাটে কেউ অসুস্থ কিংবা দুরঘর্টনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে থাকলেও, কেউ কারও দিকে ফিরে তাকানোর সময় পায় না। এছাড়া ড্রেনের ময়লা দুর্গন্ধ, রাস্তার ধূলাবালি, সীসাযুক্ত বাতাস, বাযু দূষণ এসব তো আছেই। এই সবকিছু নিয়ে প্রতিটি মানুষকে এই শহরে থাকতে হয়। তবে এসবের পাশাপাশি ভালোকিছু দিকও আছে। তথ্য প্রযুক্তি, ইন্টারনেট সুবিধা, নাটক থিয়েটার, শিল্প-সংস্কৃতি এসব কিছুই সকলের নাগালের মধ্যেই ঘটে। তাছাড়া ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, নানারকম প্রাচীন স্থাপত্য ইত্যাদি বিষয়গুলো মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। কিছু কিছু জিনিস বিনোদনের খোরাক যোগায়। এই সমস্ত কিছু মিলেই একটি বিচিত্র শহর ঢাকা। এই শহর আর কিছু দিতে পারুক আর না পারুক, জীবন যুদ্ধে কিভাবে টিকে থাকতে হয় সেই শিক্ষাটা অন্তত দিতে পারে।
তবে ঢাকা শহরের জীবন যাপনে বড় সংকট হলো পরিবেশ। রাজধানী ঢাকা কখনো দূষণের নগরী হিসেবে বিশ্বর প্রথম হয়, আবার কখনো দ্বিতীয়। ঢাকা সিটি বিশ্বের শীর্ষ ঘনবসতিপূর্ণ নগরী। ঢাকার বাতাসের গুণগত মান শীতকাল এলে খুবই অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। আবার বর্ষাকালে একটু উন্নত হয়। ইট ভাটা, নির্মাণাধীন স্থাপনার ধুলা এবং পরিবহনের কালো ধোঁয়া পরিবেশ দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। তাই দূষিত বাতাস যদি দীর্ঘদিন গ্রহণ করা যায় তাহলে শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক এবং ক্যান্সারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ঢাকায় বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিককে এইসব ঝুঁকি মেনে নিয়েই জীবন যাপন করতে হয়।
