একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের উঠোনে কিংবা শহরের বারান্দায় বসে পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের গল্প শোনার দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। দাদা-দাদি, নানা-নানির অভিজ্ঞতা, স্মৃতি আর জীবনের গল্পে মুখর থাকত পারিবারিক পরিবেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। আধুনিক জীবনযাত্রা, কর্মব্যস্ততা, নগরায়ণ এবং বৈশ্বিক অভিবাসনের ফলে পরিবার ও সমাজের কাঠামোতে এসেছে বড় পরিবর্তন।
আজকের পৃথিবীতে সন্তানদের ভালো শিক্ষা, উন্নত ক্যারিয়ার এবং প্রতিষ্ঠিত জীবনের স্বপ্ন দেখেন প্রায় সব বাবা-মা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হলে সন্তানদের অনেকেই কর্মসূত্রে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের জীবন হয়ে ওঠে ব্যস্ত, সময় হয়ে ওঠে সীমিত। এটি কারও অবহেলা নয়; বরং সময়ের বাস্তবতা।
এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং প্রয়োজন নতুনভাবে চিন্তা করার।
আমাদের সমাজে এখনো “বৃদ্ধাশ্রম” শব্দটি অনেকের কাছে নেতিবাচক। কেউ মনে করেন এটি পারিবারিক ব্যর্থতার প্রতীক, কেউ মনে করেন সন্তানদের অবহেলার ফল। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি একজন প্রবীণ ব্যক্তি নিরাপদ পরিবেশে, সমবয়সীদের সান্নিধ্যে, উন্নত চিকিৎসাসেবা ও মানসিক প্রশান্তির মধ্যে জীবনযাপন করেন, তবে সেটিকে কেন করুণার চোখে দেখা হবে?
বার্ধক্য জীবনের শেষ অধ্যায় হলেও এটি কখনোই জীবনের মূল্যহীন অধ্যায় নয়। বরং এই সময়ে একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সম্মান, নিরাপত্তা, যত্ন এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা।
বিশ্বজুড়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীও ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশও একটি বার্ধক্যমুখী সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। তাই প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা আজ আর বিলাসিতা নয়; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন।
এই প্রেক্ষাপটে জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক হসপিটাল বাংলাদেশের প্রবীণসেবার ধারণায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
এটি কেবল একটি রিটায়ারমেন্ট হোম নয়; এটি মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন।
এখানে একজন প্রবীণ ব্যক্তি শুধুমাত্র থাকার জায়গা পান না; তিনি পান একটি সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ। পান সমবয়সীদের সান্নিধ্য, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি, পুনর্বাসন, ডিমেনশিয়া কেয়ার, প্যালিয়েটিভ কেয়ার এবং মানসিক প্রশান্তির পরিবেশ।
এই মহতী উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন একজন স্বপ্নবান মানুষ—প্রফেসর সরদার এ. নাঈম।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি সমন্বিত সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। তাঁর স্বপ্ন ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে বার্ধক্যকে করুণা নয়, সম্মানের চোখে দেখা হবে; যেখানে প্রবীণরা নিজেদেরকে পরিবারের বা সমাজের বোঝা মনে করবেন না; বরং অনুভব করবেন যে তাঁরাও সমাজের সম্মানিত ও মূল্যবান অংশ।
প্রফেসর সরদার এ. নাঈমের এই স্বপ্ন আজ ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। তাঁর দূরদর্শী চিন্তা বাংলাদেশের প্রবীণসেবার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
অনেকেই মনে করেন, বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানো। নিঃসন্দেহে এটি সত্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবার ভাগ্যে সেই সুযোগ সমানভাবে আসে না। কর্মব্যস্ততা, ভৌগোলিক দূরত্ব কিংবা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় প্রিয়জনদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়।
কিন্তু দূরে থাকলেই কি জীবন থেমে যায়?
একদমই নয়।
বরং সমবয়সীদের সঙ্গে গল্প, স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া, প্রার্থনা, হাঁটাহাঁটি, চিকিৎসা সেবা এবং নিরাপদ পরিবেশ—এসব মিলিয়ে বার্ধক্যের জীবন হতে পারে আরও শান্ত, আরও অর্থবহ এবং আরও আনন্দময়।
প্রকৃতপক্ষে, প্রবীণরা অতীতের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকেন, কিন্তু তাঁদের বর্তমানটিও সুন্দর হওয়ার অধিকার রয়েছে। জীবনের শেষ অধ্যায়টিও আনন্দ, মর্যাদা এবং প্রশান্তিতে ভরপুর হতে পারে—যদি আমরা সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি।
জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক হসপিটাল সেই মানবিক দায়িত্ব পালনেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
সময় এসেছে আমাদের চিন্তাধারা বদলানোর। এটিকে দেখতে হবে একটি আধুনিক, মানবিক এবং বাস্তবসম্মত সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে, যা প্রবীণদের জন্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, মর্যাদা এবং মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করে।
কারণ জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের মতো বার্ধক্যও সুন্দর হওয়ার অধিকার রাখে।
আর যে সমাজ তার প্রবীণদের সম্মান দিতে জানে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য, মানবিক এবং উন্নত সমাজ।
লেখক :
ডা.ফয়সল মাহমুদ
সহকারী পরিচালক
জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক হসপিটাল






