বাংলাদেশে ডেঙ্গু বাড়ার যত কারণ

0
176

বছরের প্রায় শেষের দিকে এসে বাংলাদেশে ডেংগুর দাপট কিছুটা কমলেও সংক্রমণের প্রকোপ চলছেই। ডেঙ্গু রোগ, এর ভাইরাস ও ভাইরাসবাহী মশার জীবনাচার, ধর্ম ও ধরণের পরিবর্তনের কারণে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু বাড়ার কারণ নিয়ে লিখেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেব মতে এ বছর রেকর্ড পৌনে তিন লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ১ হাজার ৪ শত। প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। এ পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্টগন দেশের পরিবেশ ও জলবায়ু, এডিস মশার জীবন চক্র ও ধারায় পরিবর্তন, নতুন নতুন ডেঙ্গু ভাইরাসের আবির্ভাব ও সংক্রমণ, রোগের প্রকৃতির পরিবর্তন, মশারোধী কেমিক্যালস অকার্যকরীতা, জনসচেতনতার অভাব, সময়োপযোগী ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা এবং সমন্বয়ের অভাব ইত্যাদিকে দায়ী বলে চিহ্নিত করেছেন।

 

১.পরিবেশ ও জলবায়ু:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের পরিবেশ ও জলবায়ুকে ডেঙ্গু সংক্রমনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননের সঙ্গে বৃষ্টি ও তাপমাত্রার সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের দেশে সাধারণত মে-জুন থেকে বৃষ্টিপাত বাড়তে শুরু করে এবং তাপমাত্রাও বেশি থাকে। ডেঙ্গু সংক্রমণের শুরু থেকে প্রতীয়মান ছিল যে, আমাদের দেশে বছরের মে-জুন থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং সেটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বরে।

২০১৯ সালে আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ছিল সর্বোচ্চ; সেপ্টেম্বরেই সেটি কমতে থাকে। ২০২২ সালে জুন-জুলাইয়ে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকলেও সেটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে অক্টোবরে। ২০২৩ সালের মে মাস থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং খুব অস্বাভাবিকভাবে জুলাই মাসেই অন্যান্য বছরের রেকর্ড ভেঙে এখনও তার প্রকোপ চলছে।

বৃষ্টি ছাড়াও ঢাকাসহ সারাদেশে প্রচুর নির্মাণ কাজ হচ্ছে। নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে একনাগাড়ে অনেক দিন পানি আটকে থাকে। সেখানে এডিস মশা প্রতিনিয়তই ডিম ছেড়ে বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে সারা দেশে সারা বছর মশার বংশ অবাধে বৃদ্ধি পাচ্ছে ডেঙ্গু বৃদ্ধি পেয়েছে পুরো মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই।

২. এডিস মশার জীবনাচারে পরিবর্তন:

গবেষণা অনুসারে, এডিস মশা দিনের বেলায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে বলে সূর্যোদয়ের প্রায় ২ ঘণ্টা পর এবং সূর্যাস্তের কয়েক ঘণ্টা আগে বেশি কামড়ায়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দেশের সর্বত্র বিদ্যুৎ বাতি ব্যবহার ও আলোর আধিক্যের কারণে এ মশা সূর্যাস্তের পরও মানুষকে কামড়াতে পারে, ফলশ্রুতিতে সংক্রমণও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৩. নতুন নতুন ডেঙ্গু ভাইরাসের আবির্ভাব ও সংক্রমণ:

ডেঙ্গুর চারটি ভ্যারিয়েন্ট আছে। সেগুলো হলো—ডেন-১, ২, ৩ ও ৪; বহির্বিশ্বে ডেন-৫ এর উপস্থিতি সন্দেহও করা হচ্ছে। তুলনামূলক মারাত্মক হচ্ছে ডেন-৩। বাংলাদেশে ডেন-১, ২ ও ৩ এ তিন ধরনের ডেঙ্গু আগে থেকেই ছিল। এবার যুক্ত হয়েছে ভ্যারিয়েন্ট ডেন-৪। সারা দেশে টাইপ-৪ ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ডেঙ্গু আক্রান্তদের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেখা গেছে, এদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ডেন-৪ ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক বার আক্রান্তের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরণের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ডেঙ্গুর এ গতি-প্রকৃতি পরিবর্তনের তথ্য সাধারণ মানুষের অনেকেরই জানা নেই। ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।

৪. ডেঙ্গু রোগের প্রকৃতির পরিবর্তন:

ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রথম দিকে শতভাগ মানুষের জ্বর উপসর্গ ছিল, নব্বই শতাংশের মাথা ব্যাথা ও গোড়ালিতে ব্যাথা পাওয়া যেত; অর্ধেকেরও কম রোগীর রক্তপাত উপসর্গ ছিল, পরবর্তীতে জ্বর উপসর্গ কমে গিয়ে খাদ্য নালী সম্পর্কিত উপসর্গ বেড়ে যায়, বাড়ে রক্তপাত সমস্যা ও শক সিনড্রোম। এবার ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ শক সিনড্রোম। মৃত রোগীর ৬০ শতাংশের বেশি রোগীর মধ্যে ডেঙ্গুর শক সিনড্রোম দেখা গেছে।

৫. মশারোধী কেমিক্যালসের অকার্যকরীতা:

মশা রোধী ওষুধ বা কেমিক্যালস স্প্রের মাধ্যমে কার্যকরী ভাবে মশার লার্ভা কিংবা মশা মেরে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। বিভিন্ন দেশ এ পদ্ধতি ব্যবহারে সফল হয়েছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন প্রজাতির মশা এসব কেমিক্যালসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে- সক্ষম হয়েছে বলে গবেষণা রিপোর্টে পাওয়া যায়। এছাড়া পূর্ণ বয়স্ক মশা ফগিং এলাকা থেকে উড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে সক্ষম হয়। তাছাড়া অনেক কেমিক্যালস মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বিধায় অনেক দেশ এ পদ্ধতি ব্যবহার বন্ধও করে দিয়েছে।

৬. জনসচেতনতার অভাব:

প্রতিরোধযোগ্য রোগ নির্মূলে জনসচেতনতা অন্যতম মুখ্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত কার্যক্রম, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পদের সুষম বণ্টন ও কমিউনিটির অংশীদারিত্ব মূল চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচিত। মশার উৎস নির্মূলে জনগনের অংশ গ্রহন ছাড়া সফল হওয়া প্রায় অসম্ভব। বাসস্থান, বাসস্থানের আশপাশ পরিচছন্ন রাখা এবং যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলার বদভ্যাস পরিবর্তন না করলে শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষের পক্ষে মশার বংশ বৃদ্ধি রোধ করা অসম্ভব।

বৈশ্বিক ঝুঁকি বৃদ্ধি, মশার জীবনাচার ও ভাইরাসের ধরনে পরিবর্তনের পাশাপাশি মশা নির্মূলে কার্যকরী কর্মসূচীর ঘাটতি এবং জনগনের সচেতন অংশগ্রহণে ব্যত্যয়, এ বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।