ডেঙ্গু আক্রান্তের কারণে প্লাটিলেট শব্দটির সঙ্গে আমরা কম বেশি পরিচিত। ফ্রিজে রক্ত সংরক্ষণ করার পর সেই রক্ত থেকে প্লাটিলেট তৈরি করা যায় না। কারণ +২ ডিগ্রি থেকে +৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় প্লাটিলেট কার্যকর থাকে না। প্লাটিলেট সংরক্ষণের তাপমাত্রা +২০ ডিগ্রি থেকে +২৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং এজিটেটরে সব সময় মৃদু ঝাঁকুনিতে পাঁচ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
এখন, এক প্রতিষ্ঠানের ডাক্তার চার ব্যাগ ফ্রিজে সংরক্ষিত রক্ত থেকে প্লাটিলেট তৈরি করার জন্য বললেন। অন্য এক প্রতিষ্ঠানের ডাক্তার প্লাটিলেট তখন পরিসঞ্চালন করা হবে না বলে জানালেন এবং এ জন্য ব্লাড ব্যাংকের ফ্রিজে সংরক্ষণের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। সেই প্লাটিলেট পরের দিন পরিসঞ্চালন করতে গিয়ে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন।
ফ্রেশ প্লাটিলেট বলে কোনো টার্ম আছে কি?
ফ্রেশ প্লাটিলেট বিষয়টি লেখা হচ্ছে অহরহ। ৪ থেকে ৬ জনের রক্ত নিয়ে যে রেন্ডম ডোনার প্লাটিলেট তৈরি করা হয় সেটা পরিসঞ্চালন করলে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার প্লাটিলেট বাড়ে যদি সঠিক পদ্ধতিতে তৈরি এবং পরিসঞ্চালন করা হয়। সিঙ্গেল ডোনার মানে এ্যাফেরেরেসিস পদ্ধতিতে একজনের থেকে প্লাটিলেট সংগ্রহ করলে ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার প্লাটিলেট বাড়ে। এই বৃদ্ধি এক ঘণ্টার মধ্যে দেখতে হয়। একদিন পর দেখলে সঠিক বৃদ্ধি বোঝা যায় না। কারণ যে কারণে প্লাটিলেট কমছে সেই কারণেই পরিসঞ্চালিত প্লাটিলেটও কমবে। যেই চারজন ডোনারের রক্ত থেকে প্লাটিলেট তৈরি করা হলো তাদের লোহিত কণিকা কিন্তু ফ্রিজে সংরক্ষণের জন্য রাখা আছে। পুরোনো রক্ত বলে ডাক্তাররা সেটা ব্যবহার করেন না। ফলে এই অমূল্য রক্ত নষ্ট হয়।
ফ্রেশ রক্ত কী?
রক্তের উপাদান পরিসঞ্চালন করার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় বলে যখন যেটা প্রয়োজন সেটা পরিসঞ্চালন করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) আলোকে সাত দিন পর্যন্ত রক্ত ফ্রেশ। এন্টিকোয়াগুলেন্ট ভেদে রক্ত বিভিন্ন মেয়াদে রাখা হয়। আমরা সিপিডিএ১ ব্যবহার করি বলে ৩৫ দিন পর্যন্ত রক্ত ব্যবহার উপযোগী। এক ইউনিট ফ্রেশ ব্লাডে যে পরিমাণ প্লাটিলেট, ক্লটিং ফ্যাক্টর থাকে সেটা রোগীর চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট নয়। সে জন্য রক্তের উপাদান ব্যবহার জরুরি। যে রোগীর যেটা লাগবে সেটাই কেবল মাত্র পরিসঞ্চালন করা হবে। যার অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা তার জন্য রক্তের লাল অংশ পরিসঞ্চালন করতে হয়। যার প্লাটিলেট প্রয়োজন তাকে লাল রক্ত দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যার এফএফপি প্রয়োজন তাকে সেটাই দিতে হবে।
এখন রক্ত পরিসঞ্চালন মানেই রক্তের উপাদান পরিসঞ্চালন। একজন ডোনারের থেকে ৩ থেকে ৪ জন রোগীকে এই সেবা দেওয়া যায়। অহেতুক পরিসঞ্চালন জটিলতা কামানো যায়। রক্ত পরিসঞ্চালন একটি অতি সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। রক্ত কোনো টনিক নয় বা স্যালাইন নয়। শুধুমাত্র রক্ত পরিসঞ্চালন করার প্রয়োজন বিবেচনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রক্তের নানানরকম বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এমন কী জীবননাশের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
সবাই আমরা সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই। একেকজন একেক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়েছি। ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়ে পরিসঞ্চালন করুন। রোগীদের ক্ষতি করার অধিকার আমাদের কারও নেই। চল্লিশ বছর পুরোনো কায়দায় এখন আর রক্ত পরিসঞ্চালন চলে না, চলবে না। বিষয়টি বুঝুন।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা; কনসালট্যান্ট- ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।






