নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা

0
404
ফাইল ছবি

দেশে ডেঙ্গু রোগ চরম আকার ধারণ করেছে। ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগে থেকেই হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর সংখ্যা। অন্যান্য বছর ডেঙ্গু মৌসুম শুরু হওয়ার সময় রোগী বাড়লেও এবার হয়েছে তার ব্যতিক্রম। রোগীর চাপে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। ইতোমধ্যে ঢাকার তিনটি বড় সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি। গত তিন বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ডেঙ্গুর প্রকোপের মূল সময় (পিক টাইম) আসা এখনও বাকি আছে। তাই বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রকোপ থাকতে পারে নভেম্বর মাস পর্যন্ত।

২০১৯ সালে সর্বাধিক ডেঙ্গু রোগী ছিল আগস্টে

২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। ওই বছর ডেঙ্গু সন্দেহে ২৬৬টি মৃত্যু হলেও ১৬৪টি মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু বলে জানিয়েছিল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত মৃত্যু ছিল ১৭৯ জন। ওই বছর জুলাইতে ১৬ হাজার ২৫৩ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও আগস্টে তা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। সেপ্টেম্বর থেকে কমতে শুরু করে রোগীর সংখ্যা।

২০২১ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বাধিক ছিল আগস্ট-সেপ্টেম্বরে

২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতির কারণে ডেঙ্গু রোগী কম ছিল। তবে ২০২১ সালে আবারও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা গেলে জুলাই থেকে শুরু হয় রোগী বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা। সে সময় জুলাইয়ে রোগী ছিল ২ হাজার ২৮৬, আগস্টে ছিল ৭ হাজার ৬৯৮, সেপ্টেম্বরে ছিল ৭ হাজার ৮৪১, অক্টোবরে ছিল ৫ হাজার ৪৫৮, নভেম্বরে ছিল ৩ হাজার ৫৬৭ জন। সে বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছিল ২৮ হাজার ৪২৯ জন। আর মারা গিয়েছিল ১০৫ জন।

২০২২ সালে ডেঙ্গু রোগী বেশি ছিল অক্টোবর-নভেম্বরে

গত বছর ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু করে জুন থেকে। জুনে ৭৩৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও জুলাই থেকে তা দেড় হাজার ছাড়িয়ে যায়। আগস্টে ভর্তি হয় ৩ হাজার ৫২১ জন, সেপ্টেম্বরে ৯ হাজার ৯৯১, অক্টোবরে ২১ হাজার ৯৩২, নভেম্বরে ১৯ হাজার ৩৩৪ এবং ডিসেম্বরে ছিল ৫ হাজার ২৪ জন। সে বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং মারা গিয়েছিল ২৮১ জন।

মৃত্যুর সর্বকালের রেকর্ড ২০২৩ সালের জুলাইয়ে

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ বছরের ১ আগস্ট পর্যন্ত মারা গেছেন ২৬১ জন। এরমধ্যে শুধু জুলাইয়ে মারা গেছেন ২০৪ জন। এযাবৎকালে ডেঙ্গুতে এত মৃত্যু আগে কখনও দেখা যায়নি বাংলাদেশে। ডেঙ্গুতে গত বছর সর্বাধিক ২৮১ জনের মৃত্যু হয়। এরমধ্যে এক মাসে সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল নভেম্বরে ১১৩ জন। ২০১৯ সালের আগস্টে সর্বাধিক ৫২ হাজার রোগী ভর্তি হলেও মৃত্যু ছিল ৮৩ জন। এই বছরের জুলাইয়ে মোট রোগীর সংখ্যা ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।

পিক সিজন নিয়ে পরিসংখ্যান কী বলছে

গত চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালে পিক সিজন ছিল আগস্টে, ২০২১ সালে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে, ২০২২ সালে অক্টোবর ও নভেম্বরে। অর্থাৎ পিক সিজন ধীরে ধীরে বছরের শেষভাগে যাচ্ছে, আবার এই শেষভাগে যাওয়ার কারণে পরবর্তী বছরে ডেঙ্গু রোগীর প্রকোপ জানুয়ারি থেকেই দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ৫ হাজার ২৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫৬৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৭ হাজার ৯৭৮ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। অর্থাৎ মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে গেছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন  বলেন, ডেঙ্গু চিকিৎসায় রোগী ব্যবস্থাপনা ভালো থাকলে মৃত্যু কম হতে পারে। গত বছর অক্টোবরে ছিল পিক পয়েন্ট। এবার নভেম্বর পর্যন্ত সেটা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। তারপর হয়তো কমতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এখন ডেঙ্গু গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাই অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত হয়তো গণহারে ডেঙ্গু রোগী বাড়তেই থাকবে।

সারা দেশে এডিস মশা মারতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব কঠিন হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, শুধু ঢাকা নয়, ডেঙ্গু যতটা মেডিক্যাল প্রবলেম, তার থেকে বেশি এনভায়রনমেন্টাল প্রবলেম। এ ক্ষেত্রে পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং বেশি জরুরি।

তিনি বলেন, প্রাইমারি হেলথ এবং পাবলিক হেলথ এক নয়। পাবলিক হেলথ হচ্ছে জনগণকে সম্পৃক্ত করে মশা নিয়ন্ত্রণ করা। এগুলো যদি আমরা বৃদ্ধি করতে না পারি, ডেঙ্গু রোগী যদি এভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। জরুরি ভিত্তিতে মশা নিয়ন্ত্রণে একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম, যারা এই সমস্ত কাজ (মশা নিয়ন্ত্রণ) করছেন, তারা যদি এই কাজগুলো আরও বেশি করেন, তাহলে যেভাবে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটা কমানো যাবে এবং ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাও যথাযথভাবে দেওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, সারা দেশেই বর্তমানে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। এখন ঢাকা সিটির পাশাপাশি ঢাকার বাইরে রোগীর সংখ্যা বেশি। এডিস মশা যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব কঠিন হবে।

এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে আরও দেড় হাজার বেড বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানান, যেখানে শয্যা দেওয়া সম্ভব, সেখানেই প্রস্তুত করা হচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কুয়েত-মৈত্রী, কুর্মিটোলা, বার্ন ইনস্টিটিউট, যেখানে জায়গা আছে শয্যা প্রস্তুতের জন্য বলে দিয়েছি।